শাহ আলম নূর
২০২৫ সাল বাংলাদেশের তৈরী পোশাক (আরএমজি) শিল্পের জন্য ছিল একাধিক সঙ্কট ও অনিশ্চয়তার বছর। বৈশ্বিক বাজারে শুল্কঝাঁকুনি, প্রধান রফতানি গন্তব্যে চাহিদার মন্দা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি সঙ্কট, শ্রম অস্থিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা সবমিলিয়ে বছরের বড় অংশজুড়েই টিকে থাকার লড়াই চালাতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার বদলে অনেক কারখানাকেই স্বল্পমেয়াদি টিকে থাকার কৌশলে মনোযোগ দিতে হয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, ২০২৫ সালের পরিস্থিতি অনেক দিক থেকেই অতীতের বড় ধাক্কাগুলোর সাথে তুলনীয়।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, যা বাংলাদেশের একক বৃহত্তম পোশাক রফতানি গন্তব্য। এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক বাড়িয়ে দেয়। তখন বাংলাদেশী পোশাক রফতানির ওপর শুল্কহার বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে ৩৫ শতাংশ এবং সর্বশেষ ৩০ জুলাইয়ের সমঝোতার পর ২০ শতাংশে নামানো হয়।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট থেকে বাংলাদেশী পোশাক রফতানিতে এই ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কের পাশাপাশি নিয়মিত ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ কার্যকর থাকে। ফলে কার্যত শুল্কের বোঝা দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ শতাংশের কাছাকাছি।
স্প্যারো গ্রুপের এমডি শোভন ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্তির সময়, রানা প্লাজা ধস কিংবা কোভিড-১৯ মহামারীর সময় যে ধাক্কা আমরা খেয়েছি, ২০২৫ সালেও অনেকটা তেমনই চাপ অনুভব করেছি। তার মতে, বছরের বড় অংশজুড়েই অনিশ্চয়তা ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। শুল্ক আরোপের সময় আমরা পুরোপুরি অন্ধকারে ছিলাম। ক্রেতারাও তখন ধীরগতিতে চলছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুল্ক কমলেও বৈশ্বিক বাজারে মন্দা আরো গভীর হয় বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোতেই প্রভাব ফেলে, যার খেসারত দিতে হয় বাংলাদেশকেও। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও জুলাইয়ের পর থেকে রফতানিতে ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ৩৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি। তবে এই সামান্য প্রবৃদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে আছে উদ্বেগজনক বাস্তবতা। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়জুড়ে রফতানিতে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকে। ফলে ডিসেম্বরের তথ্য যুক্ত হলে সার্বিক প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যে দেখা যায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ইইউতে রফতানি ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ০৬ শতাংশ, যা ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। আরো উদ্বেগজনক হলো, বহুদিন ধরে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও রফতানি কমে ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ‘আমরা বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অপ্রচলিত তিনটি বড় বাজারেই রফতানি কমেছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সঙ্কট, ডলার ঘাটতি, উচ্চ সুদের হার এবং খেলাপি ঋণের চাপ বেড়ে যায়। অনেক রফতানিকারক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলতে সমস্যায় পড়েন। কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে সরকারিভাবে একীভূতও করতে হয়। খেলাপি ঋণ মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছানোয় আমানতকারী ও উদ্যোক্তাদের আস্থা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর প্রভাবে বেক্সিমকো, নাসা গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি বড় এবং বহু ছোট-মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে ভোক্তারা পোশাক কেনায় সংযত হয়েছেন। বড় অর্ডারের বদলে খুচরা ও ছোট অর্ডারে ঝুঁকছেন ক্রেতারা। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির সুযোগ নিয়ে চীন, ভারতসহ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ ইউরোপও নতুন বাজারে আগ্রাসীভাবে প্রবেশ করেছে, ফলে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারত্ব সঙ্কুচিত হয়েছে। চীন থেকে অর্ডার সরে আসবে এই প্রত্যাশাও পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বরং ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমার তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যাও ২০২৫ সালে পোশাক খাতকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রম অসন্তোষ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কাস্টমস হাউজের নজিরবিহীন কর্মবিরতি, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সঙ্কট উৎপাদন ও রফতানিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালে গ্যাস সঙ্কট ছিল শিল্প খাতের অন্যতম বড় বাধা। প্রয়োজনীয় ১৫ পিএসআই চাপের বিপরীতে অনেক কারখানায় মাত্র ২-৫ পিএসআই গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেছে। এর ফলে টেক্সটাইল মিলগুলোতে উৎপাদন ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় বলে জানান শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, শ্রম অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ ও কারখানা বন্ধের ঘটনাও ডেলিভারিতে বড় ধরনের বিঘœ সৃষ্টি করেছে। কাস্টমস হাউজের সম্পূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের পণ্য নষ্ট হওয়া সরাসরি রফতানি আয়ে আঘাত হেনেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বৃদ্ধি, প্রভিডেন্ট ফান্ড বাধ্যতামূলক করা এবং ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনার সময় পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করে। সেই সাথে বাংলাদেশ আইএলওর সি-১৯০, সি-১৫৫ ও সি-১৮৭ কনভেনশন অনুমোদন করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হয়। শ্রম অধিকার সংগঠনগুলো এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও শিল্প উদ্যোক্তারা বাড়তি ব্যয় ও প্রশাসনিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তবে আশার কথা হচ্ছে সব সঙ্কটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক অর্জন রয়েছে। জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে ৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ইউরোপেও রফতাানি বেড়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বাজার অংশ নিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক হিসেবে অবস্থান ধরে রাখে। এ দিকে সবুজ শিল্পায়নেও নেতৃত্ব বজায় রেখেছে দেশ। ২০২৫ সালে ৩৮টি কারখানা নতুন করে লিড সার্টিফিকেশন পায়, মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭০।
নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২৬ সালে ঘুরে দাঁড়াতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য, বাজার সম্প্রসারণ, ব্যবসার খরচ কমানো, বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে এখনই কাঠামোগত সংস্কারে না গেলে ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে এমন সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তারা।



