বিশেষ সংবাদদাতা
ঢাকঢোল পিটিয়ে আইন পাস; কিন্তু প্রয়োগে স্থবিরতা- এমন অভিযোগ এখন জোরালোভাবে উঠছে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) খাতকে ঘিরে। ২০১৩ সালের অক্টোবরে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ পাস হওয়ার পর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো আজও কার্যকর হয়নি। ফলে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বেড়েছে অনিয়ম, প্রতারণা ও ভুক্তভোগীর সংখ্যা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকায় অসাধু চক্র কার্যত দায়মুক্তি পাচ্ছে। অন্য দিকে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও পরিবেশকরা হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত।
লাইসেন্সে স্থবিরতা, বাজারে অনিশ্চয়তা : আইন পাসের পর ২২টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে। যাচাই-বাছাই শেষে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি পায়। পরবর্তীতে আরো একটি নতুন প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পেলেও এরপর আর কোনো আবেদনকারী অনুমোদন পায়নি। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ- লাইসেন্স প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক অনীহার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা বাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না। এতে প্রতিযোগিতা কমে গেছে, আর অবৈধ বা লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম বেড়েছে।
লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতর জানিয়েছে, নীতিগত ও বিধিমালাসংক্রান্ত জটিলতার কারণেই কার্যক্রম এগোচ্ছে না।
৪০ ধারা কার্যকর হয়নি : অভিযোগ কেন্দ্র নেই : আইনের ৪০ ধারা অনুযায়ী ভুক্তভোগীদের জন্য অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন ও বিধিমালা তৈরির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ১২ বছরেও এ কেন্দ্র স্থাপিত হয়নি। ফলে কেউ প্রতারিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানানো বা প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই। আইনের মূল উদ্দেশ্য- নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা- বাস্তবে অনুপস্থিত।
এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগীর আবেদন, তবু সভা হয়নি : মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আমিন উল ইসলাম, ২৫ বছরের অভিজ্ঞ একজন পেশাদার পরিবেশক। ২০২২ সালের জুন থেকে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী, সংসদীয় কমিটি ও বাণিজ্য সচিব বরাবর একাধিকবার লিখিত আবেদন করেছেন।
তার অভিযোগ- অভিযোগ কেন্দ্র না থাকায় তিনি আইনি প্রতিকার পাননি; অসাধু প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না; লাইসেন্সপ্রাপ্তদের জন্যও সমান নীতিমালা কার্যকর হয়নি।
তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিদফতর বাণিজ্য সচিবকে অংশীজনদের নিয়ে সভা করার সুপারিশ করলেও আজও সেই সভা হয়নি। তিনি সরাসরি আবেদন পাঠিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানের কাছে।
আমিন উল ইসলাম উল্লেখ করেন, ‘অভিযোগ কেন্দ্র না থাকায় আমি ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। আইনের প্রয়োগ না থাকলে প্রতারকরা আরো উৎসাহিত হবে।’
কারা লাভবান : বিশ্লেষকরা বলছেন- আইনের প্রয়োগ না হলে অবৈধ কোম্পানিগুলো লাভবান হয়; ভুক্তভোগীরা বিচ্ছিন্ন থাকেন; সৎ ব্যবসায়ীরা বাজার হারান; সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নিয়ন্ত্রিত এমএলএম সেক্টর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীনতা থাকলে এটি সহজেই প্রতারণার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
প্রশ্নের মুখে মন্ত্রণালয় : সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, বিধিমালা প্রণয়ন ও অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে একাধিক খসড়া আলোচনা হলেও তা চূড়ান্ত হয়নি। প্রশাসনিক জটিলতা ও অগ্রাধিকারের অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে।
তবে ভুক্তভোগীদের মতে- এটি কেবল ‘গড়িমসি’।
কী করা জরুরি : বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব হলো- দ্রুত অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন; অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা চালু; লাইসেন্স প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা; নিয়মিত তদারকি ও অডিট; প্রতারণার ঘটনায় দ্রুত শাস্তি।
এক দশকের বেশি সময় ধরে আইন কার্যকর না হওয়া কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়- এটি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার শামিল। মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং খাতকে বৈধ ও সুশৃঙ্খল করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নয় তো আইন থাকবে কাগজে, আর প্রতারণা চলবে মাঠে।


