শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)
পাবনার সুজানগর উপজেলার তাঁতিবন্দ জমিদারবাড়ি জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা। ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত এ জমিদারবাড়িতে বাংলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতির সাথে মুঘল ও নিওক্লাসিক্যাল শিল্পরীতির সংমিশ্রণ ঘটেছিল। একসময় এটি ছিল জমিদারদের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। বর্তমানে কালের বিবর্তনে ঐতিহাসিক এ স্থাপনা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
তাঁতিবন্দ জমিদারদের মধ্যে বিজয় গোবিন্দ চৌধুরীর সময় এ জমিদারির খ্যাতি সর্বাধিক ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ছিলেন শৌখিন ও শিকারপ্রিয় জমিদার। ইংরেজদের সাথে তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তার আমন্ত্রণে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মেও (১৮৬৯-৭২) তাঁতিবন্দে শিকারে এসেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। ইংরেজদের সাথে তার সুসম্পর্ক থাকায় ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিজয় গোবিন্দ ইংরেজ সরকারকে সহায়তা করেন বলে কথিত আছে। এ কারণে তৎকালীন গভর্নর ফ্রেডারিক হ্যালিডে (১৮৫৪-৫৮) তাকে প্রশংসা করেন এবং নীল কমিশনের সময় বিনা পাসে তাকে দু’টি কামান ও বন্দুক রাখার সরকারি অনুমতি দান করেন।
জানা যায়, পাবনা সদর থেকে প্রায় ১২ মাইল পূর্বে সুজানগরের উত্তর-পূর্ব দিকে তাঁতিবন্দ জমিদারবাড়ির অবস্থান। এ বংশের আদি নিবাস ছিল চাটমোহরের বোঁথড় গ্রামে। উপেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী দারিদ্র্যের কারণে সেখান থেকে সুজানগরের চণ্ডীপুরে বসতি স্থাপন করেন। বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ উপেন্দ্রনারায়ণ নাটোর কালেক্টরেটের সেরেস্তাদার ছিলেন। তার ছেলে গঙ্গা গোবিন্দ ও পৌত্র গুরু গোবিন্দ চৌধুরী তাঁতিবন্দের ভবানীপুরের নন্দী ও হেমরাজপুরের সরকার উপাধিধারী কায়স্থ জমিদারদের সম্পত্তি কিনে নেন এবং জমিদারি শুরু করেন।
উপেন্দ্রনারায়ণ শেষ জীবনে গোবিন্দজিউর পূজা ও সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আরাধ্য দেবতার নাম স্মরণীয় রাখতে বংশধরদের নামের শেষে ‘গোবিন্দ’ যুক্ত করার প্রচলন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এ বংশে বহু বিবাহেরও প্রচলন শুরু হয়। কুলীন ব্রাহ্মণদের জমি দান ও বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে তাঁতিবন্দে লাহিড়ী, বাগচী, রায় ও মৈত্রী উপাধিধারী ব্রাহ্মণদের বসতি গড়ে ওঠে।
গঙ্গা গোবিন্দ চৌধুরী তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমিদারি ভাগ করে দেন। বিজয় গোবিন্দের বংশধররা বড় তরফ, অভয় গোবিন্দের বংশধররা খুজা তরফ এবং দুর্গা ও বরদা গোবিন্দের বংশধররা যথাক্রমে মধ্যম ও ছোট তরফ নামে পরিচিত হন। দুর্গা ও বরদা গোবিন্দ নিঃসন্তান ছিলেন। তাদের দত্তকসন্তানদের নিয়ে দীর্ঘদিনের মামলা-মোকদ্দমায় জমিদার পরিবারের সম্পদের বড় অংশ ক্ষয়ে যায়।
তাঁতিবন্দের জমিদার পরিবারের জনহিতকর কাজেরও নানা নজির পাওয়া যায়। অভয় গোবিন্দ চৌধুরী ১৮৮৭ সালে পাবনা শহরে একটি আদর্শ জলাশয়ের জন্য জমি দান করেন। পরে এটি ‘লক্ষ্মীসাগর’ বা ‘জুবিলি ট্যাংক’ নামে পরিচিতি পায়। তার দানে পাবনা হাসপাতালের কলেরা ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। ১২৯০ বঙ্গাব্দে নিজ বাসভবনে ‘পাবনা ব্যাংক লিমিটেড’ নামে জেলার প্রথম ব্যাংক চালুরও উদ্যোগ নেন তিনি। ১৮৬৯ সালে চৌধুরী পরিবার দোগাছী থেকে তাঁতিবন্দ পর্যন্ত সড়ক নির্মাণে অর্থ দান করেন।
এ পরিবারের বিদ্যানুরাগেরও নিদর্শন রয়েছে। বরদা গোবিন্দের দত্তকপুত্র অন্নদা গোবিন্দ চৌধুরী ১৮৯০ সালে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ২০০২ সালের ২৫ নভেম্বর স্কয়ার গ্রুপের তৎকালীন চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরীর অর্থায়নে সেখানে চারতলা ভবন নির্মিত হয়।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক তাঁতিবন্দ জমিদারবাড়িটি অবহেলা ও অযতেœ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, বিজয় গোবিন্দের বৈমাত্রেয় ভাই অভয় গোবিন্দ বাড়ির সামনে একটি সুউচ্চ দোলমঞ্চ নির্মাণ করেছিলেন, যা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা যেত। কালের বিবর্তনে সেই দোলমঞ্চের কোনো স্মৃতিচিহ্নই এখন আর অবশিষ্ট নেই।



