বর্ষায় জমজমাট কাউখালীর চাই-দুয়ারিহাট

দেশীয় মাছ ধরার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত কারিগররা, বাড়ছে বিক্রি

Printed Edition
কাউখালীর একটি হাটে চলছে বেচা-কেনা : নয়া দিগন্ত
কাউখালীর একটি হাটে চলছে বেচা-কেনা : নয়া দিগন্ত

রিয়াদ মাহমুদ সিকদার কাউখালী (পিরোজপুর)

বর্ষার নতুন পানিতে খাল-বিল ও নদ-নদীতে দেশীয় মাছের আনাগোনা বাড়তেই পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চাই-দুয়ারি হাটে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। মাছ ধরার অন্যতম দেশীয় উপকরণ চাই ও দুয়ারির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রতি শুক্রবার ও সোমবার দক্ষিণ বাজারে বসা এই হাটে ভিড় করছেন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ক্রেতা ও বিক্রেতারা। খুচরা ও পাইকারি- দুই ধরনের বেচাকেনাতেই এখন সরগরম হাট।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে কাউখালী, ভান্ডারিয়া, নেছারাবাদ ও নাজিরপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চাই ও দুয়ারি তৈরির সাথে যুক্ত। বর্ষা মৌসুমের প্রায় ছয় মাস এই কুটিরশিল্পই তাদের প্রধান আয়ের উৎস। বিভিন্ন জাতের বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় এসব উপকরণ। একটি বাঁশ থেকে সাধারণত সাত থেকে আটটি চাই তৈরি করা যায়। একজন দক্ষ কারিগর দিনে পাঁচ থেকে ছয়টি চাই বা দুয়ারি তৈরি করতে পারেন।

হাটে প্রকারভেদে এক কুড়ি চাই তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে প্রতিটি চাইয়ের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কারিগরদের ভাষ্য, বর্তমানে একটি বাঁশ কিনতে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হয়। এসব চাই ও দুয়ারিতে ছোট দেশীয় মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়িও ধরা পড়ে।

চাই তৈরির কারিগর আব্দুল জলিল বলেন, বর্ষাকালে পরিবারের সবাই মিলে এই কাজই করি। তবে বাঁশের দাম, শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ খুবই কমে গেছে। তিনি বলেন, একসময় চাইয়ের চাহিদা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু খাল-বিল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছ কমে গেছে, সেই সাথে কমেছে চাইয়ের বাজারও। সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এই ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

কাউখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত অধিকাংশ দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুম। এ সময় মা মাছ ও পোনা সংরক্ষণে জেলেদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং সরকারিভাবে প্রণোদনাও দেয়া হচ্ছে। একই সাথে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ উপায়ে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। তার মতে, কারেন্ট জালসহ মাছ ধরার নিষিদ্ধ সরঞ্জামের নির্বিচার ব্যবহারের কারণে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: আসাদুজ্জামান বলেন, চাই ব্যবহার অবশ্যই প্রচলিত আইন ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এমন উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না, যাতে ছোট মাছ বা পোনা সহজেই নিধন হয়ে যায়। তিনি বলেন, দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ উপায়ে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।