- চলতি মাস থেকেই কার্যকর
- জনজীবন, শিল্প ও অর্থনীতিতে নতুন চাপ
- বাড়তি আয় হবে ১৩ হাজার কোটি টাকা
দেশে আবারো বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। এবার গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারিতে দাম বাড়ানো হয়েছে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। চলতি জুন মাস থেকেই নতুন দর কার্যকর করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক কর্মকর্তার দাবি, বিদ্যুতের এ দাম বৃদ্ধিতে তাদের বাড়তি আয় হবে ১৩ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে তারা ভর্তুকি সমন্বয় করতে পারবে। তবে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ গ্রাহক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান- সব শ্রেণীর ব্যবহারকারীর বিদ্যুৎ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
গ্রাহকের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার বিষয়ে পাওয়ার সেলের সাবেক ডিজি বিডি রহমত উল্লাহ গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিনা টেন্ডারে দায়মুক্তি আইনের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। বিদ্যুতের উৎপাদনসক্ষমতা বাড়ানো হয়। কিন্তু প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত করা হয়নি। এতে উচ্চ মূল্যের জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্ধেকই বসিয়ে রাখা হলেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা মানুষের পকেট থেকে নেয়া হচ্ছে। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিডিবির বিনা টেন্ডারের উচ্চ মূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করতে ভর্তুকি বেড়ে যাচ্ছে। আর এ ভর্তুকি কমাতে জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে, যা একটি পচা দেহে পরিণত হয়েছে। এ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আমাদের দেশীয় সম্পদ গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনের দিকে নজর দিতে হবে, পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সোলার প্যানেলের দিকে আমাদের এগোতে হবে। একই সাথে বিনা টেন্ডারের উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স বাতিল করে দিতে হবে। এছাড়া সামনে আমাদের আর কোনো পথ নেই।
বিইআরসির ঘোষণায় বলা হয়েছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সাত টাকা থেকে এক টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে আট টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রাহক বা খুচরা পর্যায়ে গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। একই সাথে সঞ্চালন চার্জও ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
কেন বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম
দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিইআরসি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দাবি করেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় ব্যয় প্রায় এক লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১২ টাকা ৯১ পয়সা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির মতে, নতুন মূল্যহার কার্যকর হলে আগামী অর্থবছরে সরকার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয় করতে পারবে। তবে মূল্যবৃদ্ধির পরও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
আবাসিক গ্রাহকদের ওপর প্রভাব
নতুন ট্যারিফ অনুযায়ী আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল সবচেয়ে বেশি বাড়বে। ব্যবহার যত বেশি হবে, ইউনিটপ্রতি খরচও তত বাড়বে। মধ্যবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এ মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। গ্রীষ্মকালে ফ্যান, ফ্রিজ ও এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের কারণে অনেক পরিবারের মাসিক বিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
কৃষি ও শিল্প খাতে প্রভাব
কৃষিসেচে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য ৬ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্যেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিল্প খাতেও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। ৩৩ কেভি শিল্প গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি দাম ১২ টাকা ৭৫ পয়সা এবং ১৩২-২৩০ কেভি শিল্প গ্রাহকদের জন্য ১২ টাকা ৬৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই ইউনিটপ্রতি প্রায় ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প খাতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, ফলে দেশীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাণিজ্যিক ও সেবা খাতে চাপ
বাণিজ্যিক ও অফিস শ্রেণীর গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের মূল্য ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ২ টাকা ৩৫ পয়সা বেশি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও উপাসনালয়ের ক্ষেত্রেও ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫০ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন, রাস্তার বাতি ও পানির পাম্প পরিচালনার খরচও বেড়েছে। ফলে নগর সেবা ও পরিবহন খাতেও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হবে।
গ্রাহকদের উদ্বেগ
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা কবীর হোসেন বলেন, ‘সব কিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।’ অনেক ভোক্তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। তারা মনে করেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে খাতটির অপচয় ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন ছিল।
মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে পণ্যের দাম বাড়বে। কৃষিসেচ ব্যয় বাড়লে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে পরিবহন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং সেবা খাতের ব্যয়ও বাড়বে। বর্তমানে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ এমনিতেই চাপে রয়েছে। নতুন এই মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কিছুটা কমাতে সহায়তা করলেও এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের জন্য এই সিদ্ধান্ত নতুন আর্থিক বোঝা তৈরি করবে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় রোধ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
আবাসিক বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার
ইউনিট -- নতুন দর -- বৃদ্ধি
- ০-৫০ -- ৫.৩২ টাকা -- ৬৯ পয়সা
- ০-৭৫ -- ৬.১৮ টাকা -- ৯২ পয়সা
- ৭৬-২০০ -- ৮.৫০ টাকা -- ১.০৩ টাকা
- ২০১-৩০০ -- ৯.১০ টাকা -- ১.৫১ টাকা
- ৩০১-৪০০ -- ৯.৬২ টাকা -- ১.৬০ টাকা
- ৪০১-৬০০ -- ১৫.০১ টাকা -- ২.৩৪ টাকা
- ৬০০+ -- ১৭.৩৫ টাকা -- ২.৭৪ টাকা
বিদ্যুতের গড় মূল্যবৃদ্ধি
পাইকারি মূল্য
- পুরাতন: ৭.০০ টাকা
- নতুন: ৮.৩৯ টাকা
খুচরা মূল্য
- পুরাতন: ৯.১১ টাকা
- নতুন: ১০.৬৩ টাকা
সঞ্চালন চার্জ
- পুরাতন: ৩১ পয়সা
- নতুন: ৩৯ পয়সা
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমার্স ফোরামের (সিএফ) সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন মালেক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ বয়ে আনবে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কয়েকদিন আগেই বাড়নো হয়েছিল। এর ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে এটাই ছিল সরকারের কৌশল। তিনি বলেন, এসব উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর। মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। নির্ধারিত পরিমাণ আয় দিয়ে তুলনামূলক কম চাহিদা পূাণ করতে পারবে। এর প্রভাব সরাসরি জনজীবনের ওপর পড়বে। তিনি বলেন, আতঙ্কের বিষয় হলো, এর পরেই আসবে সরকারি কর্মচারীদের জন্য পে-স্কেল। ৬০ হাজার মানুষের সুবিধা দিতে গিয়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষই বেকায়দায় পড়ে যাবে। পণ্যমূল্য আরো অগ্নিরূপ ধারণ করবে। এতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের দুর্ভোগ আরো বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, সাধারণ ভোক্তাদের কথা ভেবে সরকারের উচিত বিদ্যুতের সিস্টেম লসের নামে চুরি বন্ধ করা, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে মানুষের পকেট কাটা বন্ধ করা। পাশাপাশি দুর্নীতির মাধ্যমে পাওয়া বিনা টেন্ডারের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লাইসেন্স বাতিল করা। এতে ভর্তুকি আপনাআপনিই কমে যাবে। বিদ্যুতের মূল্য তখন বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না, বরং মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে বিদ্যুতের দাম আরো কমানো যাবে।
নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। তিনি জানান, এ থেকে উত্তোরণের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের গুণগত মান উন্নত করতে হবে। শিল্প খাতে বিদ্যুতের লোডশেডিং শূণ্যে নামিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় জেনারেটরের মাধ্যমে শিল্পের চাকা চালু রাখতে গেলে শিল্পোদ্যোক্তারা উভয় সঙ্কটে পড়ে যাবেন। একদিকে বাড়তি বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করতে হবে, অপরদিকে উচ্চ মূল্যের ডিজেল চালিত ক্যাপটিভ পাওয়ার ও জেনারেটর চালাতে গেলে প্রতিযোগী দেশের সাথে পণ্যের মূল্যের প্রতিযোগিতায় তারা হেরে যাবেন। বিদেশী ক্রেতারা অন্য দেশ থেকে পণ্য কিনবে, যা আমাদের দেশীয় শিল্পের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় বয়ে আনবে।



