বিমানের ফ্লাইটে ফেরা হাজীদের লাগেজ ‘তছনছ’ করা হয় জেদ্দা এয়ারপোর্টেই

কানাডা থেকে এক ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে লাগেজ কাটার সংবাদ প্রথম প্রকাশ করেন

সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে হাজীদের নিয়ে দেশে ফেরা একটি ফ্লাইটের দেড় শ’ লাগেজ কাটার ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে দেশ বিদেশে। এ নিয়ে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটিও। যদিও এখন পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসব লাগেজ কাটা হয়েছে বলে সুদূর কানাডা থেকে যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল তার কোনো সত্যতাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ খুঁজে পায়নি। তবে যে অর্ধশত যাত্রীর লাগেজ ‘তছনছ’ অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেগুলো শাহজালাল বিমানবন্দরে নয়, সৌদি আরবের জেদ্দা কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই ঘটেছে।

মনির হোসেন
Printed Edition

সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে হাজীদের নিয়ে দেশে ফেরা একটি ফ্লাইটের দেড় শ’ লাগেজ কাটার ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে দেশ বিদেশে। এ নিয়ে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটিও। যদিও এখন পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসব লাগেজ কাটা হয়েছে বলে সুদূর কানাডা থেকে যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল তার কোনো সত্যতাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ খুঁজে পায়নি। তবে যে অর্ধশত যাত্রীর লাগেজ ‘তছনছ’ অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেগুলো শাহজালাল বিমানবন্দরে নয়, সৌদি আরবের জেদ্দা কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই ঘটেছে।

জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো গতকাল নয়া দিগন্তকে নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছে, হাজীদের ওই ফ্লাইটে লাগেজ উঠার আগেই এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির সদস্যরা তল্লাশি চালান। পরে ওই লাগেজগুলো থেকেই যেগুলো পরিবহনযোগ্য নয় সেগুলো রেখে এলোমেলোভাবেই লাগেজগুলোকে আবার এয়ারক্র্যাফটে তুলে দেয়া হয়।

এদিকে ঢাকার সিভিল এভিয়েশন অথরিটি ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে লাগেজ কাটার অভিযোগ উঠার পর এর নেপথ্য কী লুকিয়ে থাকতে পারে সে রহস্য খুঁজে বের করতে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এরপরই শুরু হয় অনুসন্ধানপর্ব, যা গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল বলে সিভিল এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা জানান।

গতকাল শনিবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে লাগেজ কাটার সর্বশেষ তথ্য জানিয়ে বলেন, শুনেছি এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজই (শনিবার) দেয়া হতে পারে। তবে আমার কাছে এখনো এই তদন্ত সম্পর্কিত কোনো তথ্য আসেনি। তবে তিনি এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেন, গত বৃহস্পতিবার জেদ্দা থেকে হাজীদের নিয়ে যে ফ্লাইট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছিল সেই এয়ারক্র্যাফট থেকে লাগেজ নামানো, গাড়িতে তোলা এবং সেগুলো বেল্টে পাঠানো পর্যন্ত প্রতিটি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। শুধু তাই নয়, বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে দায়িত্বরত প্রত্যেকের গায়ে থাকা বডিঅর্ন ক্যামেরার ফুজেটও খতিয়ে দেখা হয়। কিন্তু কোথাও কেউ আমাদের কোনো কর্মী অথবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কেউ লাগেজ কেটেছে এমন কোনো দৃশ্য দেখেনি। এরপরই আমরা নিশ্চিত হয়েছি কিছু সংখ্যক লাগেজ যদি এলোমেলো হয়েও থাকে, তাহলে সেটিও ঢাকা বিমানবন্দরে নয়, জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই হয়ে থাকতে পারে। আরো অধিক তদন্তের জন্য জেদ্দা কিং আবদুল আজিজ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কানাডা থেকে এক ব্যক্তি তার ফেসবুক পেজে প্রথমে জেদ্দা থেকে হাজীদের নিয়ে দেশে ফেরা লাগেজের মধ্যে দেড় শ’ লাগেজ কাটা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। এ সময় তিনি একটি ছবিও দেন। তার সেই অভিযোগের সূত্র ধরেই আমরা ঘটনার অনুসন্ধান শুরু করি। কানাডার ওই ব্যক্তির বাবাও দেড় শ’ লাগেজের একজন যাত্রী ছিলেন বলে পরে জানতে পারি। সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে আক্ষেপ করে বলেন, দেড় শ’ লাগেজ ঢাকায় কাটার অভিযোগ তোলা হলেও একজন যাত্রীও কিন্তু তাদের লাগেজ থেকে মালামাল খোয়া যাওয়ার বিষয়ে বিমানের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখায় লিখিত অভিযোগ করেননি। পরে অবশ্য ওই ফ্লাইটের একজন যাত্রী তার লাগেজ থেকে শুধু একটি মানিব্যাগ খোয়া গেছে বলে লিখিত অভিযোগ দেন। তবে ওই মানিব্যাগ থেকে কী খোয়া গেছে তা তিনি জানাতে পারেননি।

সিভিল এভিয়েশন অথরিটি ঢাকায় ফ্লাইট অবতরণের পর সিসিটিভি ফুটেজের একটি ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে। সেখানে পরিষ্কার দেখা যায়, এয়ারক্র্যাফট থেকে লাগেজগুলো ছোট গাড়িতে তুলে সেগুলো একে একে বেল্টে ঘুরতে। এ সময় নিয়ন সাইন দিয়ে লাগেজগুলোর প্রত্যেকটিতেই লাইট মেরে মেরে দেখা হচ্ছিল লাগেজ কাটা আছে কি-না। কিন্তু লাগেজ কেউ কাটছে বা লাগেজ থেকে কিছু চুরি করছে এমন কোনো দৃশ্য ওই সিসিটিভি ফুজেটের কোথাও দেখা যায়নি। এতে আমাদের কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হন, লাগেজ কাটার ঘটনাটি ঢাকায় ঘটেনি।

গতকাল শনিবার বিকেলে জেদ্দা এয়ারপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি নয়া দিগন্তকে বলেন, ৩ জুন জেদ্দা কিং আবদুল আজিজ এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকার উদ্দেশ ছেড়ে আসা বিমানের (বিজি-৩১০৪) ফ্লাইটটি হাজীদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। এর আগে ওই ফ্লাইটের যাত্রীরা যথারীতি তাদের মালামাল বুকিং করে এয়ারক্র্যাফটে উঠে পড়েন। ওই সময় এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির সদস্যরা আকস্মিক বিমানের ফ্লাইটে তল্লাশি চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। যদিও তারা সচরাচর কোনো ফ্লাইটে তল্লাশি করেন না। ওই দিনের ফ্লাইট তল্লাশি করে তছনছ থাকা প্রতিটি লাগেজেই জমজমের পানির বোতল পায়। আইকাও এর নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো লাগেজ থেকে বের করার নিয়ম। জেদ্দা এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ সেগুলো রেখে লাগেজগুলো অগোছালোভাবেই আবারো এয়ারক্র্যাফটে তুলে দেয়। ঢাকায় ফ্লাইট নামার পর লাগেজ কাটার যে অভিযোগ করা হয় তা মোটেও সত্য নয় বলে জানান ওই ব্যক্তি।

উল্লেখ্য, গত বুধবার বেলা পৌনে ৩টায় জেদ্দা থেকে ছেড়ে আসা ফ্লাইটটি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। যাত্রীদের ব্যাগেজ হোল্ড থেকে কনটেইনার প্যালেট এবং ট্রলি-ডলির মাধ্যমে ৫ নম্বর বেল্টে পাঠানো হয়। বেল্ট থেকে ব্যাগেজ গ্রহণের সময় কয়েকজন যাত্রী তাদের ব্যাগেজ ক্ষতিগ্রস্ত ও মালামাল নিখোঁজ চুরির অভিযোগ উত্থাপন করেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, পরিচালকের দফতর (এভসেক) জানায়, পর্যবেক্ষণ ও তদন্তকার্যক্রমে ব্যাগেজ মেকআপ ও হ্যান্ডেলিং এরিয়ায় কোনো ধরনের অননুমোদিত প্রবেশ, হস্তক্ষেপ বা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই ফ্লাইটে মোট ব্যাগেজ ছিল ৮৩৬টি। যা ফ্লাইট ম্যানিফেস্ট অনুযায়ী হ্যান্ডলিং করা হয়েছে।

স্কোয়াড্রন লিডার এস এম তানজিল আহসান উপপরিচালক (এভসেক) তার সুপারিশে উল্লেখ করেন, ফ্লাইটের লোডিং কার্যক্রম যাচাইয়ের লক্ষ্য জেদ্দা কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরের কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে ব্যাগেজ মেকআপ এরিয়ার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অধিকতর তদন্তকার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

গতকাল প্যান ব্রাইট ট্র্যাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের স্বত্বাধিকারী ও হাবের সাবেক নেতা রুহুল আমিন মিন্টু নয়া দিগন্তকে এই প্রসঙ্গে বলেন, আমার হজ ব্যবসার অভিজ্ঞতা দীর্ঘ ৪৫ বছরের। আগে জমজমের পানি হাজী সাহেবরা সাথে করে আনতে পারতেন। কিন্তু সৌদি সরকার নতুন নিয়ম চালু করায় হাজীদের জমজমের পানি তারা ঢাকায় নিরাপদে পৌঁছে দিচ্ছেন। এরপরও যারা দেশটির সরকারের নিয়ম না মেনে জমজমের পানি আনতে যাবেন তাদের লাগেজ জেদ্দা এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি যে কোনো সময় কেটেই ওই পানি রেখে দেবেন। সেক্ষেত্রে লাগেজ খুললে তো সেটি তছনছ হবেই। তাই সব হাজীকে নিজ লাগেজে জমজমের পানি বহন না আনার জন্য তিনি পরামর্শ দেন। এ ঘটনার পর গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত দেশে ফেরা হাজীদের বিমানবন্দরের ১৫০টি লাগেজ থেকে মালামাল চুরির অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য বলে জানান।