ক্রীড়া প্রতিবেদক
এত কিছু করেও বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে একটি ছোট্ট আক্ষেপ থেকে গেছে। ২০০৬ সালে ফতুল্লায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪২৭ রান করেছিল বাংলাদেশ। শাহরিয়ার নাফীসের সেঞ্চুরিতে গড়া সেই রেকর্ড এবার প্রায় ভেঙেই ফেলেছিল তারা। কিন্তু ৪২৬ রানে থেমে যাওয়ায় রেকর্ডে একটু আক্ষেপ বৈকি ! এক রান কম পড়েছে। তাই বলে বাংলাদেশের অর্জনটাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে নিজেদের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড ছোঁয়া হয়নি। কিন্তু সেই ৪২৬-এর আড়ালে যে গল্পটা তৈরি হয়েছে, সেটি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসেই আলাদা করে জায়গা নিতেই পারে।
অস্ট্রেলিয়ার মাঠে ১৩৮ ওভার ব্যাট করেছে বাংলাদেশ। প্রায় সাড়ে সাত বছর ধরে কোনো সফরকারী দল যেখানে ১৩৫ ওভারও পার করতে পারেনি, সেখানে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস দাঁড়িয়েছে ১৩৮ ওভারে। বাংলাদেশের এই ইনিংসের আরেকটি দিক হলো সময়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সিডনি টেস্টে ভারত ১৬৭.২ ওভার ব্যাট করার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আর কোনো বিদেশী দল এত দীর্ঘ ইনিংস খেলতে পারেনি। এরপর একে একে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ভারত, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলেছে। কিন্তু কেউই ১৩৫ ওভার অতিক্রম করতে পারেনি। প্রায় ৯১ মাস ও ৭২ ইনিংস পর সেই অপেক্ষা ভাঙল বাংলাদেশ।
সংখ্যার হিসেবে অল্প কিছুটা এগিয়ে যাওয়া হলেও বার্তাটা বড়-অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাংলাদেশ এবার শুধু টিকে থাকতে আসেনি। শেষ ব্যাটার হিসেবে ইবাদত হোসেন চৌধুরী যখন জশ হ্যাজেলউডের শর্ট বলে কট বিহাইন্ড হলেন, তখন বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি। হ্যাজেলউডের জন্য মুহূর্তটি ছিল আরো বিশেষ। বাংলাদেশের ৪২৬ রান থামানোর পথে ছয় উইকেট নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারে ৩০০ উইকেট পূর্ণ করেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার নবম বোলার হিসেবে ঢুকেছেন এই অভিজাত ক্লাবে।
কিন্তু হ্যাজেলউডের মাইলফলকের দিনেও ম্যাচের ফোকাসটা শান্ত বাহিনীর দিকেই বেশি। কারণ প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয়ার পর বাংলাদেশের হয়েছে ২২৮ রানের লিড। বিদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের এটাই সর্বোচ্চ লিড। এর আগে ১৯২ রানের লিডই ছিল তাদের সেরা। এই লিডের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তানজিদ হাসান তামিমের। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন বাঁ হাতি ওপেনার। ১৯৭ বলের ধৈর্যশীল ইনিংসে তার সংগ্রহ ১০১। ক্যারিয়ারের প্রথম শতক বলেই হয়তো এই ইনিংসের গুরুত্ব আরো বেশি।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৪ রান করেছেন ১২৬ বলে। মেহেদী হাসান মিরাজ ১৫৪ বলে ৬৫। মুমিনুল হকের ৪৯ রান থেমেছে ফিফটির এক রান আগে। এমনকি নিচের সারির ব্যাটাররাও অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সহজে ছাড়েননি। বিশেষ করে হাসান মাহমুদের ব্যাটিং আলাদা করে নজর কাড়ার মতো। ৮ নম্বরে নেমে তিনি খেলেছেন ৯২ বল। রান করেছেন ১৪। স্কোরকার্ডে সংখ্যাটি খুব বড় নয়, কিন্তু ৯২ বলের এই প্রতিরোধ বাংলাদেশের ইনিংসকে যে বাড়তি সময় দিয়েছে, সেটিই পরে লিডকে ২২৮ রানে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদও শেষ দিকে যথাক্রমে ১৭ ও ১৪ রান করে ব্যবধানটা বাড়িয়েছেন।
রেকর্ডের হিসাবের বাইরে গেলে বাংলাদেশের অর্জনটা আরো বড়। অস্ট্রেলিয়া ২০০০ সালের পর প্রথম ইনিংসে অন্তত ১৫০ রানে পিছিয়ে গিয়ে মাত্র তিনবার টেস্ট জিতেছে। দুই শতাধিক রানে পিছিয়ে থেকেও জয়ের নজির মাত্র একবার-২০১০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিডনিতে। এবার বাংলাদেশের লিড ২২৮।
অবশ্য ইতিহাস অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে আরো কিছু কঠিন উদাহরণও রেখে দিয়েছে। ১৯৯২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৯৭ রানে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জিতেছিল তারা। ১৯৫০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষেও ২৩৬ রানে পিছিয়ে থেকে জয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ফলে বাংলাদেশের জন্য কাজ শেষ হয়ে যায়নি, বরং এখন শুরু হয়েছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তৃতীয় দিন শেষে স্বাগতিকরা ৪ উইকেটে ১৬১ রানে দিন শেষ করে। বাংলাদেশের চেয়ে এখনো ৬৭ রানে পিছিয়ে অস্ট্রেলিয়া। সঙ্গতভাবেই এগিয়ে থেকেই চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করবে টাইগাররা! বিশাল স্বপ্নে ভর করা বাংলাদেশ এক নতুন গল্প লিখতে পারবে কি!!



