হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার উপকূলঘেঁষা চর আতাউরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা গরু-মহিষের চারণভূমি ও বন বিভাগের সংরতি বনাঞ্চলের একাংশ দখলের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি প্রভাবশালী একটি মহল চরটির বিভিন্ন অংশে মাটির স্তূপ তৈরি করে সীমানা নির্ধারণ করে দখলে নিয়ে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা শুরু করেছে। এতে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা বাথানভিত্তিক পশুপালন হুমকির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাথান মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত বেঁধে যেতে পারে।
মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর আতাউর তমরদ্দি ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। চরটির একটি বড় অংশ বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানে প্রায় ৩০০ একর ম্যানগ্রোভ রিজার্ভ বন রয়েছে। পাশাপাশি বিস্তীর্ণ চরজুড়ে বহু বছর ধরে শ’ শ’ বাথান সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার গরু, মহিষ ও ভেড়া পালন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, এই চর শুধু পশুপালনের জন্যই নয়, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
সম্প্রতি চর আতাউর ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি স্থানে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা হচ্ছে। চরজুড়ে সারিবদ্ধভাবে মাটির স্তূপ তৈরি করে সেখানে গাছের ডাল পুঁতে সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব জমি দখল করে চাষাবাদের প্রস্তুতি চলছে। তাদের দাবি, যারা জমি দখল করছেন, তাদের অনেকেই স্থানীয় ভূমিহীন নন; বরং বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
চরের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বসবাসকারী কয়েকজন জানান, চরটির দেিণ একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও দু’টি গুচ্ছগ্রামে প্রায় ৪০০ পরিবার বসবাস করছে। মূল ভূখণ্ড থেকে চর আতাউর বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেখানে প্রশাসনের উপস্থিতিও খুবই সীমিত। এ সুযোগে দখলচেষ্টা ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে।
এক বাথান মালিক আবু তাহের বলেন, গত বছর থেকে চর দখলের চেষ্টা শুরু হয়েছে। বর্ষার সময় তাদের বসতির আশপাশের জমিতে চাষাবাদ শুরু করা হয়। এতে গরু-মহিষ চরানোর জায়গা কমে গেছে। বাধা দিলে ভয়ভীতি ও হামলার শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, পর্যাপ্ত চারণভূমি না থাকায় অনেক মালিককে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে পশু চরানোর ব্যবস্থা করতে হয়।
আরেক বাথান মালিক মফিজ উদ্দিন বলেন, তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে এই চরে মহিষ পালন করছেন। আগে কখনো এভাবে জমি দখলের চেষ্টা দেখেননি তিনি। এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে জমি দখলের চেষ্টা করছে। এতে উত্তেজনা বাড়ছে।
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পশুপালনের সাথে যুক্ত নুরুল ইসলাম বলেন, জলোচ্ছ্বাসের সময় পশু রায় মালিকরা নিজেদের উদ্যোগে কিল্লা ও পুকুর নির্মাণ করেছেন। এখন তাদেরকে এই চর ছেড়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। চরটি সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী গোচারণভূমি হিসেবে সংরণের দাবি জানান এই পশুপালক।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, চরটি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দুর্গম অবস্থান এবং জনবল সঙ্কটের কারণে দখল ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোস্টগার্ডের কাছে লিখিতভাবে সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছর একই সময়ে চর আতাউরের উত্তর পাশের জাগলার চরে দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বাধে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ছয়জন নিহত হন। সেই ঘটনার পর নতুন করে দখলচেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, বাথান মালিকদের কাছ থেকে চর দখলের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি জমি অনুমতি ছাড়া কেউ দখলে নিতে পারে না। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে।



