হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ‘পাপরা’

Printed Edition
হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ‘পাপরা’
হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ‘পাপরা’

লুৎফর রহমান মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা)

একসময় গ্রামবাংলার বিয়ে বা যেকোনো সামাজিক উৎসব মানেই ছিল নানা ধরনের দেশীয় আচার-অনুষ্ঠান ও হাতে তৈরি শিল্পসামগ্রীর বাহারি আয়োজন। এসব লোকজ আয়োজনের অন্যতম এক উজ্জ্বল অনুষঙ্গ ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘পাপরা’। আশির ও নব্বইয়ের দশকেও গ্রামীণ নারীরা নিপুণ হাতে নিজ নিজ ঘরে এ পাপরা তৈরি করতেন। আধুনিকতার ছোঁয়া এবং বাজারে প্লাস্টিক ও রেডিমেড পণ্যের সহজলভ্যতায় সে রঙিন ঐতিহ্য আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।

তবে বিলুপ্তপ্রায় এ গ্রামীণ লোকজ শিল্প কর্মটির এক ঝলক দেখা মিলেছে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের পানুর গ্রামের একটি বাড়িতে। সম্প্রতি সে বাড়িতে কয়েকজন প্রবীণ ও মধ্যবয়সী নারীকে নিজেদের হাতে উৎসবমুখর পরিবেশে পাপরা তৈরি করতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন পর গ্রামে হস্তশিল্পের এমন পুরনো ও পরিচিত দৃশ্য দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ এবং কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।

গ্রামের প্রবীণ নারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দশক আগেও বিয়ের কনে দেখার দিন থেকে শুরু করে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান পর্যন্ত কয়েক দিন ধরে বাড়ির নারীরা একত্র হয়ে বৈঠক বসাতেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়ে একসাথে বসে আড্ডা, গল্প আর গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি করা হতো এ বিশেষ পাপরা। শুধু কোনো কারুশিল্পসামগ্রী হিসেবে নয়; বরং এটি ছিল একসময় গ্রামীণ নারীদের পারস্পরিক সুসম্পর্ক, অকৃত্রিম সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আনন্দের প্রতীক।

কালের পরিক্রমায় গ্রামের জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। হাতে তৈরি নিখুঁত শিল্পের জায়গা দখল করে নিয়েছে যান্ত্রিক কারখানা ও আধুনিক প্লাস্টিকের বাজারজাত পণ্য। ফলে নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা এর মূল কারিগরি কৌশল ও ঐতিহ্যবাহী তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না। অথচ একসময় যা ছিল প্রতিটি গৃহস্থবাড়ির নিত্যদিনের অনুষঙ্গ, তা এখন শুধুই ইতিহাস।

স্থানীয় প্রবীণরা মনে করেন, লোকজ কারুশিল্পগুলো গ্রামীণ জীবনের শিকড় ও লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। হারিয়ে যেতে বসা এসব ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে যদি এসব তৈরির কৌশল সঠিকভাবে শেখানো গেলে শত বছরের লোকজ ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি নারীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয় এক প্রবীণ নারী বলেন, আগে বিয়ের মৌসুমে মেয়েরা সবাই মিলে গান গেয়ে পাপরা বানাতো। এখন আর এসব চোখে পড়ে না। বহু বছর পর আবার নিজে হাতে এটা বানাতে পেরে এক লহমায় শৈশবের সে মধুর দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিলাম।