সংশোধিত ব্যাংক রেজুলিউশন ২০২৬

শেয়ারবাজার ও আমানতকারীর স্বার্থ নিয়ে নতুন শঙ্কা

আস্থাহীনতা সৃষ্টি হতে পারে পুঁজিবাজারে

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আমানত ও বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে যদি ব্যাংকের মালিকানা আবার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়, তবে তা শুধু পুঁজিবাজারেই নয়, পুরো আর্থিক খাতেই আস্থাহীনতা আরো গভীর করবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এমন আস্থাহীনতার কারণে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থাহীনতা আরো গভীর অবস্থায় চলে যাবে।

Printed Edition

নাসির উদ্দীন চৌধুরী

ব্যাংক খাতের গভীর সঙ্কট সামাল দিতে প্রণীত ব্যাংক রেজুলিউশন আইন ২০২৬ নতুন করে দেশের আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সঙ্কটে পড়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করার পর পুরনো মালিকানা বা শেয়ারধারীদের ভূমিকা নিয়ে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তা বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আমানত ও বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে যদি ব্যাংকের মালিকানা আবার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়, তবে তা শুধু পুঁজিবাজারেই নয়, পুরো আর্থিক খাতেই আস্থাহীনতা আরো গভীর করবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এমন আস্থাহীনতার কারণে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থাহীনতা আরো গভীর অবস্থায় চলে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত পরিবর্তন বা মালিকানা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সবসময়ই বিনিয়োগকারীদের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরো বেশি সংবেদনশীল। কারণ ব্যাংক শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি জনগণের আমানত, বিনিয়োগ ও আর্থিক নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের ব্যাংকিং খাতের যে ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে, তা দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও পরিকল্পিত লুটপাটের ফল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানত বিভিন্ন কৌশলে বিদেশে পাচার হলেও তা জনসমক্ষে আসেনি। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু অংশও নীরব ভূমিকা পালন করেছে। ফলে বহু ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আমানতকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আড়ালেই ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৪ সালের আগস্টে এসব ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চিত্র উন্মুক্ত হয়। দেখা যায়, কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। বিশেষ করে ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের ঋণ আত্মসাতের ঘটনা সামনে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে সঙ্কটাপন্ন পাঁচটি ব্যাংক ছিল একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন।

এই পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সাথে এসব ব্যাংকের মূলধন শূন্য ঘোষণা করে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা দেয়া হয়।

এ সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী ক্ষুদ্র ও সাধারণ শেয়ারধারীরা। কারণ মূলধন শূন্য ঘোষণার অর্থ কার্যত তাদের বিনিয়োগের পুরো মূল্য হারিয়ে যাওয়া। অনেক বিনিয়োগকারী রাতারাতি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক লুটপাট বা অব্যবস্থাপনার জন্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কোনো দায় ছিল না। তারপরও তারাই সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এর ফলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যার রেশ এখনো কাটেনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত ব্যাংক রেজুলিউশন আইন ২০২৬ আবারো এই পাঁচ ব্যাংককে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের একাংশের ধারণা, এই সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্বের উদ্যোক্তা বা মালিকদের জন্য ব্যাংকগুলোতে ফিরে আসার পথ তৈরি করা হচ্ছে। বিষয়টি সামনে আসার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে কিছু শেয়ারধারী মনে করছেন, এর মাধ্যমে হয়তো তারা তাদের হারানো বিনিয়োগের কিছু অংশ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী আশঙ্কা করছেন, একই গোষ্ঠী বা সংশ্লিষ্ট স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নতুন পরিচয়ে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরলে আবার একই ধরনের আর্থিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ড. আবু আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, শেয়ারধারীরা আবেদন করলে সরকারের দেয়া মূলধনের ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে তিন মাসের মধ্যে ব্যাংকের দখল বুঝে নিতে পারবেন। তার প্রশ্ন, ‘বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশের নিশ্চয়তা কে দেবে?’ তার মতে, দেশের বিদ্যমান আর্থিক সংস্কৃতিতে সরকারি অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা খুবই দুর্বল। অতীতে বহু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিয়ে উল্টো নতুন ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় বিপুল অঙ্কের সরকারি সহায়তার বাকি অংশ আদায় কতটা সম্ভব, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

ড. আবু আহমেদ আরো বলেন, শুধু মালিকানা হস্তান্তর নয়, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা। সরকার ইতোমধ্যে আমানত ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গেলে তারা সেই দায় কতটা নেবে, তার কোনো সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই। তার ভাষায়, ‘ব্যাংকের মালিকানা হস্তান্তরের আগে শেয়ারধারীদের বিনিয়োগ এবং আমানতকারীদের আমানতের পূর্ণ সুরক্ষা আইনি গ্যারান্টির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।’

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, যদি পুরনো মালিকদের কাছেই আবার এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়া হয়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

তার মতে, যারা একবার ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করেছে, লাখ লাখ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়েছে, তাদের হাতে আবার ব্যাংক তুলে দেয়া হলে বাজারে আস্থার সঙ্কট আরো তীব্র হবে। তিনি বলেন, ‘সরকার চাইলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে পারে। এটি অসম্ভব বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু একই গোষ্ঠীর হাতে মালিকানা গেলে আমানত ফেরত পাওয়া বা বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

ব্যাংক খাতে আস্থার সঙ্কট সরাসরি পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলে। কারণ ব্যাংকিং খাতের শেয়ার সাধারণত বাজারের বড় অংশজুড়ে থাকে। ব্যাংক খাতে নেতিবাচক বার্তা গেলে তা সূচক, লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে তাৎক্ষণিক প্রভাব সৃষ্টি করে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই আইন যদি এমন ধারণা তৈরি করে যে অতীতে দায়ী গোষ্ঠীগুলো আবার ফিরে আসছে, তাহলে নতুন বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকিং খাতের শেয়ারে আগ্রহ হারাবে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে আমানতকারীদের জন্য বিষয়টি আরো স্পর্শকাতর। বহু গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে তাদের আমানতের অর্থ উত্তোলনে ভোগান্তির শিকার। অনেকে চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিজেদের অর্থ সময়মতো পাননি। অভিযোগ রয়েছে, অনেক আমানতকারী অর্থ ফেরত পাওয়ার আগেই মারা গেছেন। সরকার ইতোমধ্যে ধাপে ধাপে কিছু অর্থ ফেরত দেয়া শুরু করেছে। তবে পুরো অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক রেজুলিউশন আইনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যাংকব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, আমানতের নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। কিন্তু যদি এই আইন বিতর্কিত মালিকানা পুনর্বহালের পথ খুলে দেয়, তাহলে তা আর্থিক খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। সব মিলিয়ে, ব্যাংক রেজুলিউশন ২০২৬ এখন শুধু একটি আইনগত সংশোধনী নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাত, আমানতকারীদের নিরাপত্তা এবং পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ আস্থার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।