ডা: মাহমুদা মিতু
ফ্যালোপিয়ান টিউব (সাধারণত ‘টিউব’ বলা হয়) দু’টি অঙ্গ যা জরায়ুর দু’দিকে যুক্ত থাকে। টিউবটির ভেতরে শুক্রাণু এবং ডিম মিলিত হয়ে (ভবৎঃরষরুধঃরড়হ) ভ্রƒণ গঠন করে, যা পরে জরায়ুতে প্রবেশ করে এবং তারপর গর্ভাবস্থা শুরু হয়। মহিলা বন্ধ্যত্বের ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে টিউবের সমস্যা। এটি সেকেন্ডারি বন্ধ্যত্বের (যারা পূর্বে গর্ভবতী হয়েছেন অথচ বর্তমানে সন্তান ধারণে সমস্যা হচ্ছে) ক্ষেত্রে আরো সাধারণ একটি সমস্যা।
কী কারণে টিউব ব্লক হতে পারে?
বেশির ভাগ সময়ই টিউব ব্লকের সঠিক কারণ জানা যায় না। সংক্রমণ অনেকাংশেই দায়ী। যেমন যৌন সংক্রমণ (ঝঞও), বিশেষ করে ক্ল্যামাইডিয়া এবং অন্ত্র বা এপেনডিক্স থেকে সংক্রমণ। আমাদের দেশে যক্ষ্মা খুবই সাধারণ এবং শরীরের অন্য কোনো অংশ এমনকি ফুসফুস আক্রমণ না করে, নীরবে টিউব আক্রমণ করতে পারে। এন্ডোমেট্রাইটিস টিউবাল ব্লকেজের একটি সাধারণ কারণ। কোনো তলপেটের সার্জারি (ডিম্বাশয়, টিউব, জরায়ু, এমনকি এপেনডিক্স) টিউবগুলোকে ব্লক করতে পারে, যেখানে টিউবটি খোলা হতে পারে কিন্তু অন্ত্রের সাথে সংযুক্ত বা নিজেই ঘূর্ণিত হতে পারে, যাতে টিউব ডিম্বাশয়ের থেকে ডিম সংগ্রহ করতে পারে না। কখনো কখনো জরায়ুর ফাইব্রইড টিউব সঙ্কীর্ণ করে দিতে পারে। আগে এক্টপিক প্রেগন্যান্সির ইতিহাস আছে এমন মহিলাদেরও ঝুঁকি রয়েছে। কিছু অস্বাভাবিকতা, জন্মের সময় উপস্থিত থেকে টিউবগুলো ব্লক করতে পারে।
কিভাবে বুঝবেন যে টিউবগুলোতে ব্লক আছে?
দুর্ভাগ্যবশত, বেশির ভাগ নারীরই টিউবাল ব্লকের কোনো লক্ষণ থাকে না। যদি আপনার এর আগে তলপেটে সংক্রমণ, শরীরের যেকোনো অংশে যক্ষ্মা, এক্টপিক প্রেগন্যান্সি, এপেনডিক্স বা গাইনিকোলজিক্যাল সার্জারি বা আপনি মাসিকের সময় বা যৌন সম্পর্কের সময় গুরুতর ব্যথা অনুভব করেন, তবে টিউব ব্লকের সম্ভাবনা রয়েছে।
কিভাবে টিউব পরীক্ষা করা হয়?
টিউবগুলোর খোলা (পেটেন্ট) আছে কি না তা সাধারণত একটি বিশেষ এক্সরে দ্বারা পরীক্ষা করা হয়, যা ঐুংঃবৎড়-ঝধষঢ়রহমড়-এৎধস (ঐঝএ) নামে পরিচিত, যার মধ্যে একটি তরল পদার্থ জরায়ুর ভেতরে দেয়া হবে। এটি সস্তা এবং সহজেই পাওয়া যায়। তবে কিছু মহিলা এইচএসজি-র সময় অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। সাধারণত কিছু ব্যথার ওষুধ প্রক্রিয়া চলাকালীন দেয়া হয়।
আরেকটি পদ্ধতি হলো ঝধষরহব ওহভঁংরড়হ ঝড়হড়মৎধঢ়যু (ঝওঝ), যাতে যোনির ভেতরে আল্ট্রাসাউন্ড প্রোব (ঞঠঝ) প্রবেশ করে জরায়ুতে স্যালাইন দেয়া হয়। এটি এইচএসজি-র চেয়ে আরো সঠিক এবং মহিলারা কম অস্বস্তি বোধ করেন।
উভয় এইচএসজি এবং এসআইএস কোনো এনেস্থেসিয়া ছাড়া, আউটডোরেই করা হয়।
কখন ল্যাপারোস্কপি পরামর্শ দেয়া হয়?
যদি এইচএসজি বা এসআইএস উভয়েই দেখা যায় দু’টি টিউবই অবরুদ্ধ আছে, তবে তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার একমাত্র উপায় হলো ল্যাপারোস্কপি। তার কারণ, কখনো কখনো এইচএসজি বা এসআইএসের সময় টিউবের পেশিগুলোর সঙ্কোচনের কারণে ‘ঋধষংব চড়ংরঃরাব’ ফলাফল হতে পারে; এর মানে হলো যে, যদি টিউবগুলোকে পরীক্ষার সময় ব্লক বলা হয়, তবে ল্যাপারোস্কপির সময় আসলে টিউবগুলো প্রকৃতপক্ষে খোলা পাওয়া যায়। এছাড়াও অন্য কোনো কারণে (যেমন সিস্টের রোগ বা তীব্র ব্যথা) ল্যাপারোস্কপির দরকার হলে বা এইচএসজি বা এসআইএস প্রযুক্তিগত সমস্যার জন্য করা সম্ভব না হলে ল্যাপারোস্কপির দ্বারা টিউব পরীক্ষার পরামর্শ দেয়া হয়।
ল্যাপারোস্কপিতে সাধারণত এনেস্থেসিয়া করে পেটের মধ্যে দু’টি বা তিনটি ছোট ফুটোর (কবু ঐড়ষব ঝঁৎমবৎু) করা হয় এবং একটি রঙিন উপাদান (উুব) দিয়ে পরীক্ষা করা হয়।
এইচএসজিতে টিউব ব্লক পাওয়া গেলে কী করণীয়?
আপনি এখনো টিউব চেক করার জন্য দ্বিতীয় পরীক্ষা হিসাবে ঝওঝ বিবেচনা করতে পারেন। যা হোক, যদি ঝওঝ ও ‘ব্লক’ দেখায়, তারপর কেবল দু’টি রাস্তা আছে। আপনি ল্যাপারোস্কপি বিবেচনা করতে পারেন বা সরাসরি ওঠঋ এ যেতে পারেন। এটি নির্ভর করে আপনার বয়স, অন্যান্য কিছু কারণ (শুক্রাণু এবং ডিম্বাশয়ের অবস্থা), বন্ধ্যত্বের সময়কাল এবং আপনার ইচ্ছার ওপর।
ল্যাপারোস্কপির সুবিধা ও অসুবিধাগুলো কী?
যদি আপনি কম বয়সী হন, অন্য কারণগুলো স্বাভাবিক এবং বন্ধ্যত্বটি কম সময়কালের হয়, তবে ল্যাপারোস্কপি আপনার জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি হতে পারে। যদি ল্যাপারোস্কপি টিউব খোলা থাকে, তবে আপনার অবস্থার ওপর নির্ভর করে, আপনি স্বাভাবিকভাবেই গর্ভধারণের জন্য ঙাঁষধঃরড়হ ওহফঁপঃরড়হ বা ওষুধের দ্বারা বা ওটও (ওহঃৎধঁঃবৎরহব ওহংবসরহধঃরড়হ) দ্বারা চেষ্টা করতে পারেন।
কখনো কখনো ল্যাপারোস্কপি দ্বারা ব্লক অপসারণ করার প্রচেষ্টা করা যেতে পারে। একই সময়ে, আপনার ডিম্বাশয়, জরায়ু এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার অবস্থা ভালোভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে এবং প্রয়োজন হলে তা চিকিৎসাও করা যায়।
কিন্তু যদি ল্যাপারোস্কপিতে দু’টি টিউবই বন্ধ দেখা যায়, তা হলে ওঠঋ প্রয়োজন হবে। ল্যাপারোস্কপি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিরাপদ পদ্ধতি হলেও, কিছু অ্যানথেসিয়া এবং সার্জারি সংক্রান্ত ঝুঁকি রয়েছে।
কখন ওঠঋ-এর জন্য যেতে হবে?
যদি আপনার ডিম্বাশয় বা স্বামীর শুক্রাণুগুলো সন্তোষজনক না হয়, আপনার বয়স বেশি হয় বা বন্ধ্যত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়, সরাসরি আইভিএফ যাওয়া আপনার জন্য ভালো বিকল্প হবে। সেই ক্ষেত্রে, আপনি ল্যাপারোস্কপি সম্পর্কিত ঝুঁকি ও খরচ এড়াতে পারেন। অবশ্যই, যদি ল্যাপারোস্কপি টিউবের ব্লক নিশ্চিত করে, তবে আপনার জন্য একমাত্র চিকিৎসা ওঠঋ, আবার যদি টিউবগুলো খোলা থাকা সত্ত্বেও আপনি ল্যাপারোস্কপির পরে ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে গর্ভধারণ করতে ব্যর্থ হন, তখন আপনাকে ওঠঋ করার কথা ভাবতে হতে পারে।
লেখিকা : গাইনি বিশেষজ্ঞ



