বিশ্বকে জলবায়ু বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে সামরিক খাতের প্রসার

Printed Edition

মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলায় বিশ্বজুড়ে যখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক সামরিক খাত ও প্রতিরক্ষা শিল্প পৃথিবীর পরিবেশের জন্য মারাত্মক এক নিরবচ্ছিন্ন হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং সামরিক সঙ্ঘাত- উভয় প্রক্রিয়াই দ্রুতগতিতে বৈশ্বিক পরিবেশ বিনষ্ট করছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা খাতের ক্ষতিকর প্রভাব বেসামরিক বিমান ও আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহনের সম্মিলিত জলবায়ু ক্ষতিকেও ছাপিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষকদের মতে, সরাসরি যুদ্ধের প্রভাব ব্যতিরেকেও বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর নিয়মিত কার্যক্রমই বৈশ্বিক গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৩.৩ থেকে ৭ শতাংশের জন্য দায়ী, যা শিল্পোন্নত রাষ্ট্র রাশিয়ার মোট বার্ষিক নিঃসরণের চেয়েও বেশি। উচ্চ মাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণেই মূলত এই ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান, হেলিকপ্টার, যুদ্ধজাহাজ ও সাঁজোয়া যান পরিচালনা করতে দৈনিক বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েল ও ডিজেল পোড়াতে হয়। উপরন্তু, সরাসরি যুদ্ধ না থাকলেও নিয়মিত সামরিক মহড়া, কর্মী স্থানান্তর ও ঘাঁটি রক্ষণাবেক্ষণের ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর কার্বন যুক্ত হচ্ছে। সার্বক্ষণিক সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামো পরিচালনায় ব্যবহৃত তাপ ও বিদ্যুৎ পরোক্ষভাবে এই সঙ্কটে জ্বালানি জোগাচ্ছে। অস্ত্র উৎপাদন ও যুদ্ধের বিধ্বংসী ব্যবহার থেকে তৈরি কার্বন শৃঙ্খল চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মারণাস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ ও সাঁজোয়া যান তৈরির প্রক্রিয়া বিপুল কার্বন নির্গমন ঘটায়। পরবর্তীতে যুদ্ধের ময়দানে যখন এসব প্রযুক্তির প্রযোগ ঘটে, তখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। সঙ্ঘাতকালে সামরিক যানের অতিরিক্ত ব্যবহার, জ্বালানি ডিপোতে আক্রমণ এবং বোমার আঘাতে শহরের অগ্নিকাণ্ড বায়ুমণ্ডলে ভয়াবহ বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে দিচ্ছে।

যুদ্ধের ইতি ঘটলেও পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব বন্ধ হয় না। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও শহর পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত কার্বন-ঘনত্বযুক্ত হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় কার্বন নির্গমনের রূপ নেয়। এর পাশাপাশি যুদ্ধজনিত বনভূমি ধ্বংস, মাটির ধারণক্ষমতা হ্রাস এবং বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রকৃতির স্বাভাবিক কার্বন শোষণ ক্ষমতা স্থবির হয়ে পড়ছে। বিশ্বজুড়ে চলমান সামরিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ন্যাটোর সাম্প্রতিক সামরিক পুনর্সজ্জিতকরণ কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক বাজেট ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক অতিরিক্ত কোটি কোটি টন গ্রিন হাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন গবেষকরা। বেসামরিক খাত যখন সবুজ প্রযুক্তি ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা করছে, সামরিক খাত সেখানে নির্গমন বাড়িয়ে চলেছে। সামরিক খাতের এই অত্যধিক ব্যয় বাস্তবে নবায়নযোগ্য শক্তি, সার্বজনীন যাতায়াতব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিশ্বজুড়ে জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচিকে অর্থসঙ্কটে ফেলছে।