চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, দেশ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে আমরা যারা লড়াই করছি। আর অপর পক্ষ হচ্ছে যারা এসব অপরাধকে পুনর্বাসনে মরিয়া হয়ে কাজ করছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনকারী, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের ভোট দিবে না। তিনি বলেন, জনগণের রায় নিয়ে নির্বাচিত হয়ে আমরা আগামীতে এমন একটি দেশ গড়ব যেখানে কোনো সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি থাকবে না। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও উন্নয়নের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করার জন্য তিনি ভোটারদের প্রতি আহবান জানান।
ডা: তাহের গতকাল শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত স্থানীয় ধৌড়করা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে দাঁড়িপাল্লা মার্কার বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
জনসভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক ও কুমিল্লা-৪ দেবিদ্ধার আসনে ১০ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ এবং ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম।
বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আপনাদের যে যা ভয় দেখাক না কেন আপনারা নির্বিঘেœ ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন। ওই দিনই বাংলাদেশের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হবে। ১২ তারিখে কারো যদি ভোটকেন্দ্র দখল করার চিন্তা থাকে, তাহলে তারা যেন বাড়ি থেকে মা-বাবার দোয়া নিয়ে বের হন।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরো বলেন, আমাদের ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে যে জোট রয়েছে সে জোটের অধীনে কে বাংলাদেশী বা কে বাঙালি এই ধরনে কটু তর্কের মধ্য দিয়ে বিভাজনের রাজনীতি জিইয়ে আর রাখা হবে না। বরং একতার রাজনীতির মধ্য দিয়ে আমরা একটি ফরওয়ার্ড লুকিং বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
চিওড়া ইউনিয়ন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট শিল্পপতি মহিউদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া নঈমের সভাপতিত্বে এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব মোহাম্মদ ইউসুফের সঞ্চালনায় এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কুমিল্লা জেলা উত্তরের সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম শহীদ, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমির মাহফুজুর রহমান, সাবেক আমির ভিপি সাহাব উদ্দিন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মজিবুর রহমান ভূঁইয়া, জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক আবু সুফিয়ান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের শূরা সদস্য আইয়ুব আলী ফরায়েজী, চৌদ্দগ্রাম পৌর জামায়াতের আমির মাওলানা মু: ইব্রাহিম, উপজেলা সেক্রেটারি বেলাল হোসাইন, খেলাফত মজলিশের উপজেলা আমির মাওলানা শাহজালাল, চিওড়া ইউনিয়ন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক শাহনেওয়াজ কাজল, উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মেশকাত উদ্দিন সেলিম, বরুড়ার উপজেলার আড্ডা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর হারুনুর রশীদ, চৌদ্দগ্রাম সদর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম, জগন্নাথদীঘি ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মজিবুর রহমান, কালিকাপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মো: রুহুল আমিন, বাতিসা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হক মজুমদার খোকন, কনকাপৈত ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মো: ইকবাল হোসেন মজুমদার, চৌদ্দগ্রাম সদর ইউপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল খায়ের, শিবিরের কুমিল্লা জেলা দক্ষিণ সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম মোল্লা, উপজেলা জামায়াতের যুব বিভাগের সভাপতি জয়নাল আবেদিন পাটোয়ারি, চিওড়া ইউনিয়ন জামায়াতের আমির শাহজালাল টিপু প্রমুখ।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাতিকে বিভ্রান্তের চেষ্টা করছে বিএনপি : গোলাম পরওয়ার
খুলনা ব্যুরো ও ফুলতলা সংবাদদাতা জানান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেনারেল সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জামায়াতকে কাফের আখ্যা দেয়া হয়েছে, যা দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভ্রান্তিকর। একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতা জামায়াতে ইসলামীকে কুফুরি ও শিরকের সাথে তুলনা করে যে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন নয়, বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সরাসরি অবমাননা। আল্লাহ, রাসূল সা:, ফেরেশতা, পরকাল ও তাকদিরে বিশ্বাসী কোনো মুসলমানকে কাফের বলার অধিকার কারো নেই। হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি অন্য মুসলিমকে কাফের বলে, সেই অপবাদ তার নিজের ওপরই বর্তায়। ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান ও গবেষণা ছাড়াই এমন মন্তব্য একটি মুসলিম দেশের রাজনৈতিক নেতার জন্য চরম লজ্জাজনক।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমানের দেয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নেয়া দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একা ছিল না। মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, পিডিপি এবং বামপন্থী দলসহ বহু রাজনৈতিক দল সে সময় ভারতীয় আগ্রাসনের আশঙ্কা থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েছিল। ইতিহাস বিকৃত না করে এই বাস্তবতা স্বীকার করা উচিত। দুঃশাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের এই অন্ধকার অধ্যায় শেষ করতে হলে দাড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। অর্থনীতিতে প্রকাশ্য লুটপাট, বিচারব্যবস্থাকে দলীয় যন্ত্রে পরিণত করা, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং ভিন্ন মত দমনে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাধ্যমে দেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এই ধ্বংসাত্মক বাস্তবতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ আজ ১০ দলের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য।
তিনি গতকাল খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার একাধিক স্থানে গণসংযোগ ও পথসভায় বক্তৃতাকালে এসব কথা বলেন।
ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের আরাফাত আবাসিক এলাকা, আলআকসা, ফলইমারী, শিবপুর, বাদুরগাছা এলাকায় গণসংযোগ ও উঠান বৈঠককালে উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম ও অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, হরিণটানা থানা কর্মপরিষদ সদস্য লিখন হোসেন প্রমুখ। সেক্রেটারি জেনারেলের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে বিএনপি থেকে নাসির গাজীর নেতৃত্বে কয়েকজন জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। পরে নাসির গাজী, কামরুল ইসলাম গাজী, সাথী আক্তার, ওবায়দুল্লাহ সোহাগ বাদুরগাছায় উঠান বৈঠকে বক্তব্য রাখেন। বিকেলে ফুলতলা উপজেলা স্বাধীনতা চত্বরে গণমিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে ওয়ার্ডের আটরা-গিলাতলা এলাকায় উঠান বৈঠকে মিয়া গোলাম পরওয়ার বক্তৃতা করেন।
সেখানে তিনি বলেন, খুলনা-৫ আসনে চাঁদাবাজ, কালো টাকার মালিক ও সন্ত্রাসীরা দলমত নির্বিশেষে রাষ্ট্র ও সমাজকে জিম্মি করে রেখেছে। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েই জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জামায়াতে ইসলামী কোনো হত্যা, গণহত্যা বা ফৌজদারি অপরাধের সাথে জড়িত নয়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ দশক পার হলেও এসব অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা বা জিডিও হয়নি এটাই প্রমাণ করে অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে সাজানো। শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাদের রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা দলীয় স্বার্থে মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি করে রাজনীতিকে যুক্তি, নৈতিকতা ও আদর্শশূন্য করে ফেলেছেন এবং জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এসব ভোঁতা অস্ত্র ব্যবহার করছে, যা জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
রাজনীতিতে বিভেদ ও শত্রুতা উসকে দিয়ে স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টাকে জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ধরনের অপরিণামদর্শী, উসকানিমূলক ও দায়িত্বহীন বক্তব্য অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।



