সঙ্ঘাতের মধ্যেই কাবুলের সাথে আলোচনা প্রত্যাখ্যান ইসলামাবাদের

Printed Edition

আলজাজিরা ও ডন

  • পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের
  • সীমান্তে বিমান ও স্থল অভিযান জোরদার ইসলামাবাদের

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সীমান্ত সংঘাত দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। কয়েক দিনের টানা পাল্টাপাল্টি হামলায় উভয় পক্ষই ভারী ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে, যদিও হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী টোরখাম ও ডুরান্ড লাইনের বিভিন্ন পয়েন্টে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে; অনেকেই ঘরছাড়া হচ্ছেন এবং খাদ্য ও চিকিৎসা সঙ্কটের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ইসলামাবাদ জানিয়েছে, তারা আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় নিষিদ্ধ উগ্রবাদী গোষ্ঠীর (টিটিপি) ঘাঁটি লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক অভিযানে ৩৩১ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একাধিক স্থল ও বিমান অভিযানে ১০৪টি চেকপোস্ট, ১৬৩টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে এবং আরো ২২টি চেকপোস্ট দখলে নেয়া হয়েছে। তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে।

অন্য দিকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার পাকিস্তানের হামলায় বেসামরিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তালেবান মুখপাত্র জবিহউল্লাহ মুজাহিদ কান্দাহারে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সামরিক চাপ সত্ত্বেও কাবুল কূটনৈতিক সমাধানের পথেই থাকতে চায়। আফগান পক্ষের দাবি, সংঘর্ষে তাদের ১৩ জন সৈন্য নিহত ও ২২ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে তারা ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার দাবি করলেও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করেছে। বিভিন্ন সূত্রে মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত ৪৮ জনে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

সঙ্ঘাতের নতুন পর্যায় শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি, যখন পাকিস্তান ‘অপারেশন গজব-লিল হক’ নামে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। ইসলামাবাদের দাবি, সীমান্তবর্তী এলাকায় বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালিয়ে টিটিপি ও সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবকাঠামো ধ্বংস করা হচ্ছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, এ পর্যন্ত অভিযানে ২৭৪ জন তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র সদস্য নিহত এবং ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

তবে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই আফগানিস্তানের সাথে সংলাপের পথ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী বলছে, আফগান তালেবান তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামাবাদের প্রধান অভিযোগÍটিটিপি আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকেই পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, বহুবার আলোচনার চেষ্টা সত্ত্বেও ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় এখন ‘কথার চেয়ে কাজের’ ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সীমান্তে অব্যাহত সংঘর্ষকে পাকিস্তান তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবেও দেখছে।

এই সঙ্ঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন, যা আফগানিস্তান কখনোই আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে অন্তত ৭৫ বার ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে টিটিপির হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তেজনা আরো জোরদার হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে বলেছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সংযম ও কূটনৈতিক পথই সর্বোত্তম সমাধান। একইভাবে জাতিসঙ্ঘ, ইরান, রাশিয়া ও কাতার সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই পাকিস্তানি হামলার নিন্দা জানিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।

এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে একটি ঘোষিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আখ্যা দিয়ে তাদের হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছে, যদিও প্রাণহানির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন।