ক্রীড়া প্রতিবেদক
কাতার থেকে উত্তর আমেরিকা- বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করার ধারাবাহিকতায় নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে ২০২২-এ সর্বোচ্চ ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জয় করেছিলেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। এবার তিন দেশের যৌথ আয়োজনে শেষ হওয়া বিশ্বকাপের ২৩তম আসরেও এর ব্যতিক্রম হলো না। ২০২৬ বিশ্বকাপেও একই কীর্তি গড়েছেন ফরাসি এই তারকা। এবারের আসরে ১০ গোল করে টানা দুই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নিজের আধিপত্য আরো একবার প্রমাণ করলেন তিনি। তিনি দু’বারই গোল্ডেন বুট জিতলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে পেছনে ফেলে। পরপর দুই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জয় করা একমাত্র খেলোয়াড় এমবাপ্পে। টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি। সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের ট্রফিটিও উঠেছে একই দলের পাউ কুবারসির হাতে। আর চ্যাম্পিয়ন দলের উনাই সিমন পেয়েছেন সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার।
বিশ্বকাপের এবারের আসরে সেমিফাইনাল পর্যন্ত ৮ গোল নিয়ে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসির সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। যদিও ৬-৪ ব্যবধানে হেরে যায় ফরাসিরা। তবু ওই দুই গোলের সুবাদে টুর্নামেন্টে তার মোট গোল দাঁড়ায় ১০টি। শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যাই তাকে গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করে দেয়। ৮ গোল নিয়ে পেছনেই থাকলেন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি।
এমবাপ্পের এই অর্জন শুধু চলতি বিশ্বকাপেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৮ সালে ৪ গোল, ২০২২ সালে ৮ গোল এবং ২০২৬ সালে ১০ গোল- তিনটি বিশ্বকাপ মিলে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২। আর এই ২২টি গোল করেছেন তিনি সমান ২২ ম্যাচে। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয় করেছিল ফ্রান্স। সেবার সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুট ৬ গোল করে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন জয় করলেও সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় হয়েছিলেন এমবাপ্পে। সব মিলে তিনি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমন নজির গড়ে ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেছেন ফরাসি এই ফরোয়ার্ড।
তবে সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে ফ্রান্স ফাইনালে উঠার স্বপ্ন ভঙ্গ হওয়ায় ব্যক্তিগত এই সাফল্যের মধ্যেও আক্ষেপ রয়ে গেছে এমবাপ্পের। এরপর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও পরাজয়, ফলে গোল্ডেন বুট জিতলেও শিরোপাহীনভাবেই বিশ্বকাপ শেষ করতে হয়েছে তাকে। তবে দলীয় ব্যর্থতার মধ্যেও কাতারের পর উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপেও গোল্ডেন বুট জিতে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চে এক অপ্রতিরোধ্য ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে।
গোল্ডেন বল পেলেন রদ্রি
বিশ্বকাপ শুরুর আগে গুরুতর চোট কাটিয়ে ফিরলেও ছন্দ খুঁজে পেতে ধুঁকছিলেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি। সেই তিনিই কি না বিশ্ব মঞ্চে এসে অসাধারণ পারফরম্যান্সে জিতে নিলেন সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পেসহ সবাইকে টেক্কা দিয়ে বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার তিনিই! গোল করেননি, গোলে সহায়তা করেননি। কিন্তু এমনভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন, দলের শিরোপা জয়ে তার অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ‘গোল্ডেন বল’ উঠেছে তার হাতে।
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জিতেছেন চারটি, লিগ কাপ তিনটি, এফএ কাপ দু’টি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ক্লাব বিশ্বকাপ, উয়েফা সুপার কাপ, কমিউনিটি শিল্ড একটি করে। স্পেনের হয়ে জিতেছেন ২০২২-২৩ নেশন্স লিগ, ২০২৪ ইউরো। জিতেছেন ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর। সাথে এবার বিশ্বকাপে জোড়া প্রাপ্তি। দেশের হয়ে বিশ্বকাপ ও ইউরো, ক্লাবের হয়ে ইউরোপ সেরা ও ব্যালন ডি’অর জয়ীদের ছোট্ট তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার। এখানে তার সাথী গার্ড মুলার, ফ্রাঙ্ক বেকেনবাওয়া ও জিনেদিন জিদানের মতো কিংবদন্তি। সেরার স্বীকৃতি পেয়ে চমকে গেছেন নিজেও। বলেন, ‘মনে হচ্ছে যেন নিখুঁত এক চিত্রনাট্য। আমি এটা একেবারেই আশা করিনি।’
সত্যি বলতে, ‘আনন্দে আত্মহারা আমরা। এই দলটি অসাধারণ। আমরা দুইবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে কঠিন টুর্নামেন্ট। এমন কিছু অর্জন করা ছিল সবচেয়ে দুরূহ। আমরা আর্জেন্টিনার মতো একটি দুর্দান্ত দলকে হারিয়েছি, যেখানে ছিলেন ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় মেসি।’
উদীয়মান খেলোয়াড় কুবারসির
বিশ্বকাপ জিতেছে দল। স্পেনকে শিরোপা জেতানোর পথে উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন পাউ কুবারসি। বিশ্বকাপে উদীয়মান তারকার পুরস্কার পাওয়ার পেছনে কিছু পরিসংখ্যানেই তা স্পষ্ট হবে। ফাইনালে ১২৬টি পাস বাড়িয়েছিলেন কুবারসি। যার মধ্যে ১২১টিই ছিল নিখুঁত। শতকরা হিসাবে যা ৯৬ ভাগ! শুধু রক্ষণভাগে বল ধরে রাখাই নয়, স্পেনকে তিনি টেনে নিয়ে গেছেন সামনের দিকেও। প্রতিপক্ষের অর্ধে ৪৮টি পাসের মধ্যে ৪৫টিই সফল ছিল তার। আর নিজেদের অর্ধে ৭৮টি পাসের মধ্যে ৭৬টিই পৌঁছায় সতীর্থদের পায়ে।
ম্যাচে মোট ১৩৯ বার বল ছুঁয়েছেন কুবারসি। এর মধ্যে চারটি দূরপাল্লার পাসের দু’টি সফল হয়, সাথে ছিল একটি কি পাসও। ঠিক কোনো মুহূর্তে আক্রমণে উঠতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত কুবারসি নিয়েছেন একদম পাকা জহুরির মতো। এমনকি প্রতিপক্ষের গোলবারে একটি শটও নিয়েছিলেন তিনি।
বিশ্বকাপ জেতা কুবারসি বলেন, ‘সবকিছু কেমন যেন অবাস্তব মনে হচ্ছে। এই দারুণ অভিজ্ঞতার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, আমাদের মনে হলো আমরা ইতিহাস গড়ে ফেলেছি। আমি সব সময়ই বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু কখনো ভাবিনি নিউ ইয়র্কে এসে সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরব! ভাবলেই আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।’
রক্ষণের খেলোয়াড়রাই সহজ করেছে সিমনের কাজ
আসরের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার গোল্ডেন গ্লাভস জিতে কৃতিত্ব সতীর্থদের দিলেন উনাই সিমন। রক্ষণ সামলানোয় ডিফেন্ডারদের পাশাপাশি মিডফিল্ডার এমনকি ফরোয়ার্ডরাও ভূমিকা রাখায় অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক মনে করেন, তার কাজটা খুব সহজ ছিল।
তার কথায় মনে হতে পারে, তেমন কিছু না করেই বুঝি গোল্ডেন গ্লাভস জিতেছেন তিনি। ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। অনেক গোলরক্ষকের মতো হয়তো অনেক বেশি সেভ করতে হয়নি তাকে। তবে প্রায় মাঝমাঠে উঠে গিয়ে পাউ কুবারসিরা রক্ষণ সামলানোয় প্রায়ই ডি বক্স ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে বল ক্লিয়ার করতে হয়েছে তাকে। আসরে সুইপার-কিপারের ভূমিকায় দারুণ সফল সিমন।
কেবল ফাইনালেই ১১টি সেভ করেন আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। সেখানে অষ্টম ম্যাচে সিমনের সেভ কেবল ১৪টি। অর্থাৎ কেবল ১৫টি শট লক্ষেথ্য রাখতে পেরেছে আট প্রতিপক্ষ। রক্ষণের দুর্দান্ত দৃঢ়তার জন্যই সেটা সম্ভব হয়েছে। আসরের নানা সময়ে সেই কথা নিজেই বলেছেন সিমন। সেই কথাই এবার ফের বললেন রূপকের সাহাযেথ্য।
সিমন বলেন, ‘টুর্নামেন্টে যেসব গ্লাভস ব্যবহার করেছি, সেগুলো যদি কথা বলতে পারত, তাহলে দিনশেষে বলতো, ‘অন্যান্য গোলরক্ষকের মতো তোমাকে এত বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি। আমি মনে করি, এই জয়ে (গোল্ডেন গ্লাভস) সতীর্থদের সবার ভূমিকা আছে। আর এ জন্যই আমরা সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি।’



