আজ ভয়াল ৪ আগস্ট

ফেনীর সব বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যায় মহিপাল গণহত্যা

Printed Edition

শাহাদাত হোসাইন ফেনী অফিস

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এক দফার আন্দোলন চলাকালে ওই দিন ফেনী শহরের মহিপালে আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা গুলি করে নিষ্ঠুর গণহত্যা চালায়। এ সময় আট ছাত্র-জনতা শহীদ হন। আহত হন অন্তত চার শতাধিক। এক সময়ের সন্ত্রাস-সহিংসতার ভয়াল জনপদ খ্যাত ফেনীতে এর আগের সব বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যায় সেদিনের গণহত্যা। এখনো সেই দুপুরের কথা মনে উঠলে অনেকেই শিউরে ওঠেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা জানান, ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ফেনী শহরের মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকে ছাত্র-জনতা। এসময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে সেখানে তারা অবস্থান নেয়। বেলা ১টার কিছুক্ষণ পর নামাজ আদায় করে আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে ট্রাংক রোড থেকে মহিপালের দিকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে অগ্রসর হতে থাকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। অন্য দিকে পিডিবির সামনে ছাত্র-জনতা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে গুলির মুখে পিছু হটে। একপর্যায়ে হামলাকারীরা মহিপাল চৌধুরী মার্কেটের সামনে পৌঁছে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করে। মুহুর্মুহু গুলিতে কেঁপে উঠে মহিপাল। এতে একে একে গুলিবিদ্ধ হন অসংখ্য ছাত্র-জনতা। চোখের সামনে লুটিয়ে পড়ে শহীদ হন শ্রাবণ, মাসুদ, সিহাব ও শাহীসহ সাত তরুণ। পরে আরো একজনসহ আটজন শহীদ হন। তারা হলেন- ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, ছাইদুল ইসলাম শাহী, মো: সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহাম্মদ শিহাব, মাহবুবুল আলম মাসুম, জাকির হোসেন শাকিল, মো: সবুজ ও আবদুল গনি বোরহান।

এ ছাড়া আহত হন চার শতাধিক ছাত্র-জনতা। পরে বিকেল ৩টায় আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেখানে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে দুপুর ১২টায় শহরের রামপুরে ঢুকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতাদের খোঁজে গিয়ে সেখানে গুলি ছুড়ে। একপর্যায়ে বিএনপি নেতাদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ।

এ ছাড়া বেলা ১১টা থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে আওয়ামী লীগের থেমে থেমে সংঘর্ষ চললেও বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লাগাতার সংঘর্ষ চলে। এসময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের শহীদ মিনার, জেল রোড ও ট্রাংক রোড থেকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। অন্য দিকে মহিপাল হত্যাকাণ্ডের পর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কজুড়ে অবস্থান নেয় ছাত্র-জনতা। এ সময় টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ করে।

জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্র জানায়, মহিপালের ঘটনায় সাতটি হত্যা মামলাসহ মোট ২২টি মামলা হয়। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি দুই হাজার ৫০৫ জন। এখন পর্যন্ত এসব মামলায় গ্রেফতার হয়েছে এক হাজার ১৯২ জন। ২২টি মামলার মধ্যে ছয়টি হত্যা মামলাসহ ১৪টি মামলায় চার্জশিট হয়েছে। এসব মামলায় পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনী-১ আসনের এমপি আলাউদ্দিন নাসিম, ফেনী-২ আসনের নিজাম হাজারী, ফেনী-৩ আসনের মাসুদ চৌধুরীসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন নেতা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বারদের নাম রয়েছে।

এ দিকে মহিপাল গণহত্যার মামলা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে শহীদ পরিবার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনায় জড়িত ও পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অনেকেই এজাহার থেকে বাদ পড়েছে। গ্রেফতার আসামিদের কেউ কেউ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীতে অনেক দাগি সন্ত্রাসীর নাম বললেও চার্জশিটে তাদেরকে বাদ দেয়া হয়। এদিকে শহীদ পরিবারের সদস্যদেরও কেউ কেউ হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।