বিশেষ প্রতিবেদক পাকিস্তান
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে আচ্ছন্ন। এক দিকে শান্তি আলোচনার শেষ চেষ্টা হিসেবে মার্কিন নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন, অন্য দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধ্বংসাত্মক আলটিমেটাম এবং সমুদ্রে ইরানি জাহাজ জব্দের ঘটনায় পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারায়। আগামী কয়েক ঘণ্টা নির্ধারণ করবে বিশ্ব কি আরো একটি ভয়াবহ যুদ্ধের সাক্ষী হবে, নাকি কোনো নাটকীয় চুক্তিতে পৌঁছাবে।
আগামী বুধবার বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। পাকিস্তান ও মিসরের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা এখন খাদের কিনারায়। যদি আজ রাতের মধ্যে কোনো নাটকীয় সমঝোতা না হয়, তবে ট্রাম্পের দেয়া সময়সীমা পার হওয়ার সাথে সাথে মধ্যপ্রাচ্য এক সর্বাত্মক ও বিধ্বংসী মহাযুদ্ধের কবলে পড়বে। বিশ্বনেতারা এখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
পাকিস্তানে জেডি ভ্যান্স : দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর গতকাল সোমবার (২০ এপ্রিল) ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার আলোচনার প্রস্তুতি থাকলেও তা এখন ভেস্তে যাওয়ার পথে। ইসলামাবাদ এখন বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। দীর্ঘ প্রায় ৪০ দিনের সঙ্ঘাতের পর পাকিস্তান ও মিসরের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়।
মার্কিন প্রতিনিধিদল : ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে স্টিভেন উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মতো প্রভাবশালী প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। রাওয়ালপিন্ডির নুর খান বিমানঘাঁটিতে গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ছয়টি মার্কিন সামরিক বিমান উন্নত যোগাযোগ সরঞ্জাম নিয়ে অবতরণ করেছে।
ইরানের বর্জন : ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সাফ জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের ‘দ্বিমুখী আচরণ’ এবং সমুদ্রসীমায় জলদস্যুতার পর এই মুহূর্তে আলোচনার কোনো পরিবেশ নেই। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈঠক বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
আলোচনার মূল লক্ষ্য- যুদ্ধবিরতি টেকসই করা এবং ইরানকে আবারো পারমাণবিক চুক্তির কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা। তবে সর্বশেষ পরিস্থিতি এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এ দিকে হরমুজ প্রণালীতে ইরান ইতোমধ্যে জাহাজ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
নিরাপত্তার চাদরে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি : আলোচনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ইসলামাবাদ ও পাশের গ্যারিসন শহর রাওয়ালপিন্ডিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হাজার হাজার নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ট্রাম্পের আলটিমেটাম : ‘গুঁড়িয়ে দেয়ার’ হুমকি
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইরানের প্রতি কঠোরতম অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যদি ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর ও আলোচনায় নমনীয়তা না দেখায়, তাহলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালানো হবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ইরান ‘যুক্তরাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে না’ এবং তাদের কোনো পারমাণবিক অধিকার স্বীকৃত নয়। এই অবস্থান কার্যত কূটনৈতিক সমঝোতার পথকে আরো সঙ্কুচিত করে ফেলেছে।
তার দাবি : সোমবার বা মঙ্গলবারের মধ্যে ইরানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে এবং আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে হবে। স্যাটেলাইট চিত্রে ইতোমধ্যে তেহরান-কারাজ সংযোগকারী হেম্মত এক্সপ্রেসওয়ের দু’টি সেতু এবং কাস্পিয়ান সাগরগামী রেল সেতু ধ্বংসের চিহ্ন দেখা গেছে, যা ট্রাম্পের হুমকির ভয়াবহতাকে প্রমাণ করে।
‘তুসকা’ জাহাজে হামলা ও সমুদ্র উত্তেজনা
সঙ্কটের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ওমান উপসাগরে ‘তুসকা’ নামের একটি ইরানি কনটেইনার জাহাজে মার্কিন নৌ-কমান্ডোদের অভিযান।
ইরানের দাবি, জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেটির নিয়ন্ত্রণ নেয়া হয়েছে- যাকে তারা ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পাল্টা প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতি থাকলেও জাহাজে নারী ও শিশু উপস্থিত থাকায় তা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ। রোববার রাতে ওমান উপসাগরে চীন থেকে ইরানগামী ‘তুসকা’ নামক একটি বাণিজ্যিক কনটেইনার জাহাজ মার্কিন নেভি কমান্ডোরা জব্দ করে। মার্কিন দাবি : জাহাজটি নৌ-অবরোধ অমান্য করে এগিয়ে যাচ্ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, ইঞ্জিন রুমে গর্ত করে জাহাজটিকে থামানো হয়েছে।
ইরানের পাল্টা জবাব : তেহরান একে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছে। ইরানের ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ সদর দফতর জানিয়েছে, জাহাজে ক্রু সদস্যদের পরিবার (নারী ও শিশু) থাকায় তারা পাল্টা হামলা বিলম্বিত করছে। তবে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার পর ‘টার্গেট’ করা হবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে।
তেহরানের অনড় অবস্থান ও আলোচনায় অনীহা : তেহরান থেকে স্পষ্ট বার্তা এসেছে- বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসার পরিবেশ নেই। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন, ওয়াশিংটন এক দিকে কূটনীতির কথা বললেও অন্য দিকে সমুদ্রপথে সামরিক অভিযান চালিয়ে ‘অবিশ্বাসযোগ্য আচরণ’ করছে।
ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষায়, এটি ‘জাতীয় গর্ব ও সার্বভৌম অধিকারের প্রতীক’- যা কোনোভাবেই আলোচনার বিষয় হতে পারে না।
শান্তি বজায় রাখার আহ্বান রাশিয়ার
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও বিশ্ব-অর্থনীতির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর। আমরা আশা করি, সামরিক সঙ্ঘাত এড়াতে আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।’ তিনি আরো জানান, রাশিয়া সরাসরি মধ্যস্থতাকারী না হলেও একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য যেকোনো সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
যুদ্ধের ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও মানবিক সঙ্কট
গত ৪০ দিনের (২৮ ফেব্রুয়ারি-১০ এপ্রিল) যুদ্ধের একটি লোমহর্ষক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন অর্গানাইজেশন : মোট শহীদ : তিন হাজার ৩৭৫ জন (যার মধ্যে দুই হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী)।
মিনাব ট্র্যাজেডি : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন বোমা হামলায় ১৬০ জন শিশু নিহত হয়েছে।
শনাক্তকরণ : বোমা ও মিসাইলের তীব্রতায় প্রায় ৪০ শতাংশ লাশ চেনার উপায় ছিল না, যা ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে।
পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ ও আঞ্চলিক বিস্তার
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার খবর যখন তুঙ্গে, তখন লেবাননে পরিস্থিতি আরো জটিল। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের অন্তত ৩৯টি গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তাদের যোদ্ধারা ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে’ চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় আছে।
ওমান উপসাগরে মার্কিন জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। এর আগে লোহিত সাগর অঞ্চলে ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দের ঘটনায় উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়।
বিশ্ব-অর্থনীতিতে ধাক্কা
হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক ওঠানামা করছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক দিনেই ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা বাজারের অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
ইউরোপীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো জরুরি রিজার্ভ থেকে তেল সংগ্রহ শুরু করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটের আশঙ্কাকে আরো জোরালো করছে। একই সাথে চীন ও রাশিয়া এই জলপথে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি : গত ৫০ দিনের অচলাবস্থায় বিশ্ব ইতোমধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তেল হারিয়েছে। ওএমভি-সহ ইউরোপের বিভিন্ন কোম্পানি জরুরি রিজার্ভ থেকে তেল কেনা শুরু করেছে।
ইরানের সম্ভাব্য কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সামনে তিনটি কৌশল নিতে পারে-
ক্স হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি
ক্স পারমাণবিক কর্মসূচি আরো জোরদার করা
ক্স হিজবুল্লাহ ও হুতিদের মাধ্যমে প্রক্সি যুদ্ধ বিস্তৃত করা
শান্তি নাকি সর্বাত্মক যুদ্ধ?
সব দৃষ্টি এখন ইসলামাবাদের দিকে। জেডি ভ্যান্সের কূটনৈতিক মিশন কি উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারবে, নাকি ট্রাম্পের আলটিমেটাম বাস্তবে রূপ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বৃহত্তর যুদ্ধে ঠেলে দেবে- তা নির্ধারিত হতে পারে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই।
বর্তমান বাস্তবতায় কূটনীতি ও সামরিক শক্তির এই দ্বৈরথে একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্তই পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।


