নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল ড. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন মনে করেন, দীর্ঘদিন বঞ্চিত সামরিক কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন, পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা প্রদান ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তার মতে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অকালীন বা বাধ্যতামূলক অবসরের শিকার হয়েছেন, যা ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পদোন্নতি, অবসর ও শাস্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ লিখিত মানদণ্ড এবং স্বাধীন আপিল ব্যবস্থা চান। একই সাথে সংসদীয় নজরদারি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও প্রতিরক্ষা গবেষণা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
তার মতে, কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, যোগ্যতা ও পেশাগত আচরণ দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত। নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী। নিচে মেজর জেনারেল (অব:) এইচ আর এম রোকন উদ্দিনের সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
প্রশ্ন : দীর্ঘ সময় পর বঞ্চিত সামরিক কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন, পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্তকে কিভাবে দেখছেন?
মেজর জেনারেল (অব:) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন : এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ প্রায় দুই দশক ধরে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর অনেক কর্মকর্তা বিভিন্নভাবে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। কাউকে অকালীন অবসর, কাউকে বাধ্যতামূলক অবসর, কাউকে প্রশাসনিক আদেশে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট কোনো কারণও জানানো হয়নি।
১ জুলাইয়ের গেজেটের মাধ্যমে ১৫০ কর্মকর্তার পুনর্বাসন, পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটি সেই দীর্ঘ বঞ্চনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১১৫, নৌবাহিনীর ২১ ও বিমানবাহিনীর ১৪ কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে আমি মনে করি, বিষয়টি শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে কর্মকর্তাদের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার প্রশ্ন জড়িত।
প্রশ্ন : আপনি বলছেন, বিষয়টি আর্থিক সুবিধার চেয়ে মর্যাদা ও স্বীকৃতির সাথে বেশি সম্পর্কিত। কেন?
এম রোকন উদ্দিন : একজন সামরিক কর্মকর্তার জন্য চাকরি শুধু একটি পেশা নয়; এটি তার পরিচয়, মর্যাদা ও দীর্ঘদিনের পেশাগত জীবনের অংশ। কোনো কর্মকর্তা যদি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তার কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চাকরি হারান, তাহলে তার ওপর শুধু নয়, পুরো পরিবারের ওপর এর প্রভাব পড়ে।
কেউ অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছেন, কেউ সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছেন, কেউ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কারো ক্ষেত্রে গ্রেফতার বা অপহরণের অভিযোগও উঠেছে। আবার কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। এই কারণে রাষ্ট্র যখন বলে-‘আপনার সাথে অন্যায় হয়েছে’-তখন সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে না; এটি দীর্ঘদিনের একটি ক্ষতের স্বীকৃতি হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন : ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেসামরিক প্রশাসন ও পুলিশের অনেক বঞ্চিত কর্মকর্তা দ্রুত তাদের অধিকার ফিরে পেলেও সামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রায় দুই বছর লাগল। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
এম রোকন উদ্দিন : এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার ও সামরিক সদর দফতরের মধ্যে কিছু বিষয়ে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলে আলোচনা হয়েছে। একই সাথে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে বিষয়টি যথেষ্ট অগ্রাধিকার পায়নি এবং প্রশাসনিক জটিলতাও ছিল।
তবে কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করার চেয়ে আমি এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা হিসেবে দেখতে চাই। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ন্যায়বিচারের বিষয় দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা উচিত ছিল না।
প্রশ্ন : এই ঘটনা কি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী কোনো একপর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি?
এম রোকন উদ্দিন : এই প্রশ্নটি অবশ্যই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। একটি পেশাদার সামরিক বাহিনীর মৌলিক নীতি হলো- একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি, বদলি, দায়িত্ব প্রদান কিংবা অবসরের সিদ্ধান্ত তার যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও পেশাগত আচরণের ভিত্তিতে হবে।
রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে তার পেশাদারিত্ব হারায়। তখন একজন কর্মকর্তা নিজের দক্ষতা বাড়ানোর পরিবর্তে রাজনৈতিক যোগাযোগকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারেন।
এটি শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যক্তির ক্ষতি করে না; সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের মান, মনোবল ও যুদ্ধসক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পেশাগত দক্ষতার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।
প্রশ্ন : রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করা কি শুধু সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব?
এম রোকন উদ্দিন : না। এটি সরকারেরও সমান দায়িত্ব। সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক ক্ষমতা সংরক্ষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে সেটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।
একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীকে অবশ্যই নির্বাচিত বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকতে হবে। একই সাথে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পেশাগত সিদ্ধান্তগুলোও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত থাকতে হবে।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই হচ্ছে সুস্থ সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক-এর ভিত্তি।
প্রশ্ন : ভবিষ্যতে এ জাতীয় বঞ্চনা ঠেকাতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
এম রোকন উদ্দিন : প্রথমত. পদোন্নতি, বাধ্যতামূলক অবসর, অকালীন অবসর ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্য সুস্পষ্ট ও লিখিত মানদণ্ড থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত. কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তাকে যথাসম্ভব সিদ্ধান্তের কারণ জানাতে হবে। তৃতীয়ত. একটি স্বাধীন আপিল বা রিভিউ ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোনো কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে অন্যায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে মনে করলে তাকে শুধু একই প্রশাসনিক চেইনের কাছে আবেদন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত. সামরিক ট্রাইব্যুনাল ও বেসামরিক বিচারিক তদারকির মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির কার্যকর নজরদারির বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রশ্ন : এতে কি সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ গোপনীয়তা বা কমান্ড কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না?
এম রোকন উদ্দিন : অবশ্যই সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। কিন্তু গোপনীয়তা আর জবাবদিহি এক জিনিস নয়। যে সিদ্ধান্ত একজন কর্মকর্তার পুরো কর্মজীবন বদলে দিতে পারে, তার ন্যায্যতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকা দরকার। একটি পেশাদার বাহিনীর শক্তি হচ্ছে-তার সদস্যরা জানবেন যে নির্ধারিত নিয়মের বাইরে গিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করা যাবে না।
প্রশ্ন : আপনার মতে একজন কর্মকর্তার মনোবলের সাথে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক কতটা গভীর?
এম রোকন উদ্দিন : অত্যন্ত গভীর। একজন কর্মকর্তা যদি মনে করেন তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ওপর, তাহলে তার মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে। একজন পেশাদার কর্মকর্তা তখন প্রশ্ন করবেন- আমি কি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করব নাকি কার সাথে আমার সম্পর্ক আছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই মানসিকতা একটি সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ সামরিক বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র বা প্রযুক্তিতে নয়; সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে মনোবল, নেতৃত্ব ও পারস্পরিক আস্থা। আমাদের মনে রাখতে হবে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র বরাবরই আমাদের দক্ষ সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল ও ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে ।
প্রশ্ন : বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
এম রোকন উদ্দিন : বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে আমাদের বিশাল সামুদ্রিক এলাকা রয়েছে। একই সাথে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা এবং আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিবেশকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। এর সাথে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়েছে।
তাই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এখন শুধু সীমান্ত রক্ষার প্রশ্ন নয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আকাশসীমা, সাইবার নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
প্রশ্ন : আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
এম রোকন উদ্দিন : নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, সামুদ্রিক টহল সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় জাহাজের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। আমাদের সমুদ্রসীমা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল সুরক্ষার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবাহিনীর ক্ষেত্রে আধুনিক রাডার নেটওয়ার্ক, আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রেও শুধু প্রচলিত যুদ্ধ সক্ষমতা নয়; সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা, সাইবার নিরাপত্তা ও অন্যান্য অপ্রচলিত হুমকির জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন মানেই অস্ত্র কেনা?
এম রোকন উদ্দিন : একেবারেই নয়। এটি একটি বড় ভুল ধারণা। আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানে শুধু বেশি অস্ত্র বা অত্যাধুনিক প্ল্যাটফর্ম কেনা নয়। মানবসম্পদ উন্নয়ন সমান গুরুত্বপূর্ণ। কর্মকর্তাদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রতিরক্ষা নীতির জন্য গবেষণাভিত্তিক থিংকট্যাংক গড়ে তুলতে হবে। সামরিক ও বেসামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নীতিগত সমন্বয় বাড়াতে হবে।
একজন দক্ষ কর্মকর্তা এবং একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়া অত্যাধুনিক অস্ত্রও কাক্সিক্ষত ফল দিতে পারে না।
প্রশ্ন : জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ কি প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে কাজে লাগানো সম্ভব?
এম রোকন উদ্দিন : অবশ্যই। জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই অভিজ্ঞতাকে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা এবং সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি প্রতিরক্ষা কূটনীতি, যেখানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন- দুই বিষয়কে সমন্বয় করা হবে।
প্রশ্ন : বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বর্তমান পদক্ষেপ কি যথেষ্ট?
এম রোকন উদ্দিন : এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। তবে হারানো সময় ফেরত দেয়া সম্ভব নয়। কোনো কর্মকর্তা তার কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো হারিয়েছেন। কোনো পরিবারের সন্তান বাবাকে পাশে পায়নি। কোনো কর্মকর্তা সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন।
আর্থিক ক্ষতিপূরণ এসব ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। তবে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি একটি গভীর মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। তবে সরকার চাইলে এই সুপ্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনীকে দেশের প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারেন।
প্রশ্ন : তাহলে এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
এম রোকন উদ্দিন : সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না। সামরিক বাহিনীতে একজন কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে তার যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও পেশাগত আচরণ দিয়ে। রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে নয়।
একই সাথে সামরিক বাহিনীকে গণতান্ত্রিক বেসামরিক কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। অর্থাৎ সামরিক বাহিনী হবে পেশাদার, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি দায়বদ্ধ।
প্রশ্ন : ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে আপনি কেমন দেখতে চান?
এম রোকন উদ্দিন : আমি এমন একটি সামরিক বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে একজন কর্মকর্তা নিশ্চিন্তে বলতে পারেন- আমার ভবিষ্যৎ কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। সেখানে থাকবে পেশাদারিত্ব, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী মানবসম্পদ।
এই চারটি বিষয়- পেশাদারিত্ব, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন- একসাথে এগিয়ে নিতে পারলেই বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরো সক্ষম হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো সরকারের পরিবর্তনের সাথে যেন আর কোনো সামরিক কর্মকর্তার জীবন এভাবে বিপর্যস্ত না হয়। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যই হবে তার একমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়; আর পেশাগত যোগ্যতাই হবে তার অগ্রগতির একমাত্র ভিত্তি।



