রংপুর ব্যুরো
রংপুরে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করা তরুণ-তরুণীকে থানায় এনে নির্যাতনের সময় বাধা দেয়ার ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রাকিবুজ্জামান রাকিবকে মারধর এবং দম্পতিকে হেনস্তার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে। সিসিটিভি ক্যামেরায় মিলেছে সেই অমানবিকতার চিত্র। রাকিবকে খোদ তৎকালীন ওসির নেতৃত্বে মারধরের পর আবারো দুই দফায় মারধর করেন পুলিশ সদস্যরা। এ ঘটনায় ছয় কর্মকর্তাসহ ১১ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে মহানগর পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাত সাড়ে ১১টায় এ ঘটনায় গঠিত অনুসন্ধান কমিটির প্রধান রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর দফতর ও প্রশাসন) হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন পত্রে (আরপিএমপি, রংপুর স্মারক নং-৩০৩৪ (সাদা), তারিখ-০৮/০৬/২০১৬ খ্রি: তারিখ-১১/০৬/২০২৬ খ্রি:) এই বহিষ্কারাদেশ দেয়া হয়। সাময়িক বহিষ্কারাদেশ প্রাপ্তরা হলেন- এসআই মাসুদ রানা, আলম বাদশা, আক্তারুল ইসলাম, এএসআই মনিরুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম ও মেহেরুন্নেসা এবং কনস্টেবল মুশফিকুর রহমান, মুখলেসুর রহমান, রাকিব আহমেদ, লিমা সরেন ও ভাবনা রানী। এ ছাড়ও ঘটনার সময়কার ওসি আজাদ রহমানকে প্রত্যাহার করে খুলনা রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অনুসন্ধানকালে প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনা ও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এবং আরপিএমপি কোতয়ালি থানায় রক্ষিত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কর্তব্যকাজে ইচ্ছাকৃত অবহেলা, অদক্ষতা, অপেশাদার ও অসদাচরণের অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ করা হয়।’
সিসিটিভির ফুটেজ এবং বিভিন্ন নথিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঘটনার সময়কার অফিসার ইনচার্জ আজাদ রহমানের ভুল সিদ্ধান্ত, উগ্র পদক্ষেপ এবং অযোগ্য নেতৃত্ব, অপেশাদার, অসদাচরণের কারণে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে।’
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভিকটিম সিরাজুম মুনিরা মৌফি এবং রুমন বাবু উভয়ে প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং পুরুষ। উভয়ে প্রেম করে পরিবারের অমতে ইসলামী শরিয়াহ ও আইন মোতাবেক বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিষয়ে গত ৩ মে সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব রাকিবুজ্জামান রাকিব এবং ভিকটিমের পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ উভয় পরিবারের মধ্যে আপস-মীমাংসা করার উদ্দেশ্যে থানায় এসে ডিউটি অফিসারের রুমে অবস্থান করাকালে ওসি আজাদ রহমান, এসআই আলম বাদশা, আখতারুল কনেস্টবল তোতা মিয়া ডিউটি অফিসারের রুমে প্রথমে স্বামী রুমন বাবুকে মারধর করেন।’
ফুটেজের বর্ণনা দিয়ে এ বিষয়ে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সেই সময়কার ওসি আজাদ রহমান, এসআই আকতারুল ইসলাম, এএসআই আরিফুল ইসলাম এবং মনিরুল ইসলাম রাকিবকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে থানা কম্পাউন্ডের পূর্ব-উত্তর কোণে হাজতখানার সামনে নিয়ে এলোপাতাড়ি কিলঘুসি মারে। এরপর কনেস্টবল মো: মোস্তাকুর রহমান, মো: রাকিব ও মো: মোখলেসুর রহমান রাকিবকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে হাজতের ভেতরে প্রবেশ করায়। ওই সময় হাজতখানার দরজায় থাকা কনস্টেবল মো: মোস্তাকুর রহমান রাকিবের নাকে-মুখে এলোপাতাড়ি কিলঘুসি মারতে থাকে।’
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘ঘটনার সময় সিরাজুম মুনিরা মৌফি ও তার স্বামী রুমন বাবু ডিউটি অফিসারের কক্ষে অবস্থানকালে নারী এএসআই মেহেরুন্নেছার সহায়তায় নারী কনস্টেবল লিমা সরেন ও ভাবনা রানী ভিকটিম মৌফিকে জোরপূর্বক টানাহেঁচড়া করে ডিউটি অফিসারের রুমের বাইরে নিয়ে গিয়ে মৌফিকে চরমভাবে হেনস্তা করে। ’
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা-সদস্যরা কেন এই মারমুখী, অপেশাদার ও অসদাচরণ, মারধর এবং অপমানজনক ও হেনস্তামূলক আচরণ করেছেন তার কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের দ্বারা মারধরের শিকার হয়ে ভিকটিম রাকিব আহত অবস্থায় রংপুর মেডিক্যালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।



