ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্বকাপের ২৩তম আসরে এখন পর্যন্ত খেলা প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছেন লিওনেল মেসি। দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে তার দল আর্জেন্টিনাও। অন্য দিকে সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও লড়াকু সুইজারল্যান্ড। শেষ ষোলোতে অবশ্য কঠিন পরীক্ষা উতরেই শেষ আট নিশ্চিত করেছে দুই দল। এখন তাদের লক্ষ্য শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করা। লড়াইটি হতে যাচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকা বনাম ইউরোপ। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে সুইজারল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় কাল সকাল ৭টায় কানসাসে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাঠে নামবে দুই দল।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। ফলে শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে কৌশলগত লড়াই জমে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে চলেছে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক সাফল্যের পর নকআউট রাউন্ডেও তারা আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে। দলের আক্রমণভাগে রয়েছে গতি, নিখুঁত পাসিং এবং দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ের সমন্বয়। মাঝমাঠে বলের দখল ধরে রেখে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করাই তাদের বড় শক্তি। রক্ষণভাগেও আর্জেন্টিনা বেশ উন্নতি করেছে। ফুল-ব্যাকদের আক্রমণে ওঠার প্রবণতা থাকলেও তারা দ্রুত নিজেদের অবস্থানে ফিরে এসে প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম। গোলরক্ষকের আত্মবিশ্বাস ও সেন্টার-ব্যাকদের সমন্বয় দলটিকে আরো শক্তিশালী করে তুলেছে। লিওনেল স্কালোনির দলের আক্রমণের প্রাণভোমরা হচ্ছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এখন পর্যন্ত চলমান আসরে ৮ গোল নিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে যৌথভাবে শীর্ষে থেকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে আছেন বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ক।
শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে ২-০তে পিছিয়ে থেকেও ১১ মিনিটের এক সাহসী প্রত্যাবর্তনে লিওনেল স্কালোনির দল ম্যাচের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়। হারের মুখ থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিওনেল মেসি ও এনজো ফার্নান্দেজের গোলে দুর্দান্ত জয় নিয়ে শেষ আটে জায়গা করে নেয় আর্জেন্টিনা। আর এই জয়ে গত সেপ্টেম্বর থেকে আলবিসেলেস্তেদের টানা দ্বাদশ জয়। যদিও মেসি ও তার সতীর্থদের মধ্যে বয়সের ছাপ স্পষ্ট, তাদের দক্ষতা ও দৃঢ়তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংমিশ্রণই তাদের এতদূর নিয়ে এসেছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে উদ্বোধনী ম্যাচে হারের পর থেকে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ১১টি ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে এবং প্রতিবারই অন্তত দু’টি করে গোল করেছে।
দুইবার পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও আট গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের হাড্ডহাড্ডি লড়াইয়ে এগিয়ে মেসি। আক্রমণভাগে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা ছয়টি ম্যাচে প্রথম গোল করা খেলোয়াড়ের সঙ্গী হবেন জুলিয়ান আলভারেজ অথবা লাউতারো মার্টিনেজ। মিসরের বিপক্ষে এনজোর করা জয়সূচক গোলটি তৈরি করে দিয়েছিলেন মার্টিনেজই। লেফট-ব্যাকে দল নির্বাচনে লড়াই হবে ফাকুন্দো মেদিনা ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকো মধ্যে।
এ দিকে শেষ আটে টিকে থাকা ছয়টি ইউরোপীয় দলের মধ্যে একটি হিসেবে সুইজারল্যান্ড ফুটবলের জন্য এক নতুন মাইলফলক গড়তে হলে তাদের অবশ্যই বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের হারাতে হবে। সুইজারল্যান্ড দীর্ঘ দিন ধরেই ইউরোপের অন্যতম শৃঙ্খলাবদ্ধ দল হিসেবে পরিচিত। বড় দলের বিপক্ষে তারা সাধারণত রক্ষণকে শক্তিশালী রেখে সুযোগ বুঝে আক্রমণে ওঠে। শেষ ষোলোতে তাদের দৃঢ় মানসিকতা এবং ধৈর্য ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে। শক্তিশালী ডিফেন্স, মাঝমাঠে পরিশ্রমী ফুটবলার ও দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকই সুইসদের মূল অস্ত্র। দলটির সবচেয়ে শক্তি হলো দলগত সমন্বয়। তারা কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং পুরো দল এক সাথে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দিয়ে দ্রুত উইং ব্যবহার করে সামনে ওঠার কৌশলে তারা সফল।
প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে পৌঁছানোর লক্ষ্যে থাকা সুইসরা সর্বশেষ ১৯৫৪ সালে নিজেদের মাটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল। এখন পর্যন্ত অসাধারণ না হলেও নিজেদের দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে দলটি। মুরাত ইয়াকিনের দল কাতারের বিপক্ষে একটি হতাশাজনক ড্র দিয়ে তাদের অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু এরপর বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ৪-১ গোলে হারায় এবং টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক কানাডাকে ২-১ গোলে পরাজিত করে। গ্রুপ ‘বি’-এর বিজয়ী হিসেবে নকআউট পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার পর। নকআউট পর্বে আলজেরিয়াকে বিদায় করে শেষ ষোলোর ম্যাচে পেনাল্টিতে কলম্বিয়াকে হারিয়ে পরবর্তী পর্বে উত্তীর্ণ হয় সুইজারল্যান্ড।
একজন অভিজ্ঞ বাস্তববাদী হিসেবে ইয়াকিন তার দলকে আক্রমণের চেয়ে প্রতিরক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে সাজান। এই কৌশল ফলপ্রসূও হয়েছে। বাছাইপর্বসহ এই পুরো বিশ্বকাপ অভিযানে সুইজারল্যান্ড এখনো কোনো পর্যায়ে পিছিয়ে পড়েনি। স্কালোনির একটি সম্পূর্ণ ফিট স্কোয়াড পাওয়ার কথা থাকলেও ইয়াকিন তিনজন খেলোয়াড়কে নিয়ে চিন্তিত। মিশেল অ্যাবিশার, লুকা জাকেজ ও ইয়োহান মানজাম্বি।
মানজাম্বি প্রথম একাদশে জায়গা করে তিনটি গোল করেছিলেন। কিন্তু হাঁটুর চোটের কারণে শেষ ষোলোর ম্যাচটি খেলতে পারেননি। এসি মিলানের আরডন জাশারি তার জায়গা নিয়েছিলেন। ফলে এই ম্যাচেও তাকে দলে রাখা হতে পারে। আক্রমণভাগের নেতৃত্বে থাকা ব্রিল এমবোলো তার শেষ ১৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৩টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন। যদিও কলম্বিয়ার বিপক্ষে তিনি কোনো শট নিতে পারেননি এবং প্রতিপক্ষের বক্সে মাত্র একবার বল স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। রেনের এই স্ট্রাইকার জেকি আমদুনি এবং সেড্রিক ইটেনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবেন বলে আশা করা যায়।
সব মিলে মাঝমাঠের লড়াইই এই ম্যাচে হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণ গড়তে চাইবে, আর সুইজারল্যান্ড চেষ্টা করবে মাঝমাঠে চাপ সৃষ্টি করে তাদের ছন্দ নষ্ট করতে। তবে আক্রমণভাগে বৈচিত্র্য বাড়তি সুবিধা দেবে আর্জেন্টিনাকে। ডান ও বাম দুই প্রান্ত দিয়েই তারা সমান দক্ষতায় আক্রমণ গড়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি দূরপাল্লার শট এবং ছোট ছোট পাসের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার সক্ষমতাও রয়েছে। ইতিহাসও পক্ষে কথা বলছে ল্যাটিন দলটিরই। কারণ কোনো বড় টুর্নামেন্টে এর আগে আর্জেন্টিনা ১৯৬৬ সালে ২-০ গোলে এবং ১২ বছর আগে ব্রাজিলে ১-০ গোলে হারিয়েছিল সুইজারল্যান্ডকে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত সাতবার আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছে সুইজারল্যান্ড। এর মধ্যে পাঁচটি ম্যাচে জয়ী হয়েছে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর বাকি দু’টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার কোনো পরাজয় নেই। সর্বশেষ বড় মঞ্চের লড়াইয়ে ব্রাজিল বিশ্বকাপে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে (১১৮ মিনিটে) অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।



