রফিকুল হায়দার ফরহাদ - যুক্তরাষ্ট্র থেকে
বিশ্বকাপ ফুটবল সবই দিয়েছে লিওনেল মেসিকে। বলতে গেলে ইতিবাচক, নেতিবাচক কোনো রেকর্ডই যেন বাকি নেই ফুটবলের এই জীবন্ত কিংবদন্তির। তবে বিশ্বকাপের শেষটা জয়ে এবং ট্রফি হাতে হলো না মেসির। যে ধারায় তারা ফাইনাল পর্যন্ত এসেছিল, স্পেনের ঝড়ে তা মিলিয়ে গেল নিউ ইয়র্কে। ফাইনালের আগের রাতে ঝড় বৃষ্টি হয়েছিল নিউ ইয়র্কে। আটলান্টার মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিতে পাওয়া প্রতিশোধের সেই জয়ের সাফল্য এবং প্রেরণা যেন নিউ জার্সির ঝড়েই ধুয়ে মুছে গেল আলবিসেলেস্তেদের। ফাইনালে একটি দলকে তো হারতেই হবে। তবে আর্জেন্টিনার এমন অসহায় আত্মসমর্পণ এবং কোনো লড়াইই করতে না পারাটা কেউই প্রত্যাশা করেনি। মেসি, আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজদের অনুজ্জ্বল পারফরম্যান্স টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ে ব্রাজিল ও ইতালির সমকক্ষ হতে দেয়নি আর্জেন্টিনাকে। মূলত তা হয়েছে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের ক্লান্তি, ইনজুরি এবং লাল কার্ডের কারণে। সাথে স্পেনের তরুণ ফুটবলার ইয়ামাল, দানি ওলমোদের দাপটে।
এবারের বিশ্বকাপটা মেসিময় হয়েই শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির হ্যাটট্রিকে ৩-০তে জয়। এরপর একে একে অস্ট্রিয়া ও জর্দানকে হারানো। তবে নকআউট পর্ব থেকেই তারা কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে থাকে। কেপ ভার্দে, মিসর, সুইজারল্যান্ড তাদের কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিতে পিছিয়ে পড়ার আর আসল রূপে দেখা গিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। সেই ম্যাচে তাদের একের পর এক আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত ইংলিশরা শেষ পর্যন্ত ১-২ গোলে হারে।
সেমিফাইনালে ওই দুর্দান্ত জয়ের পর মনে করা হয়েছিল আর্জেন্টিনা ফাইনালে নিজেদের চেনা খেলাই উপহার দেবে স্পেনের বিপক্ষে। তবে পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল হজম করা স্পেন কোনো পাত্তাই দেয়নি মেসিদের। মাঠে বল দখলের লড়াই, প্রেসিং ফুটবল, শারীরিক সক্ষমতা- সব কিছুতেই এগিয়ে ছিল স্পেনের ফুটবলাররা। সাথে যোগ হয় আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ইনজুরি। দুই গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে মাঠ ছাড়তে হয় চোটের জন্য।
৪৩ মিনিটে ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়েন ইনফর্ম ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। যিনি ছিলেন কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক। ডিফেন্সে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আক্রমণেও যার প্রতি ম্যাচে ছিল সরব উপস্থিতি। তাকে হারিয়ে কোচ লিওনেল স্কালোনি মাঠে নামান বয়স্ক নিকোলাস ওতামেন্দিকে। এমনিতেই স্পেনের দল একেবারে বোতল-বন্দী করে রেখেছিল আর্জেন্টিনাকে। তার ওপর লিসান্দ্রো মার্টিনেজের এই চোট ধাক্কা দেয় আর্জেন্টিনাকে। এরপর যোগ হয় ইনজুরি টাইমে (৯৩ মি.) এনজো ফার্ন্দান্দেজের লাল কার্ড। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সমতাসূচক এবং মিসরের বিপক্ষে শেষ ১৬-এর ম্যাচে জয়সূচক গোল করা এই মিডফিল্ডারের লাল কার্ড আরো বিপদে ফেলে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
এরপরও বিপদ পিছু ছাড়ছিল না আর্জেন্টিনার। ৯০ মিনিট শেষে অতিরিক্ত সময়ে প্রথমার্ধে (১০১ মি.) ইনজুরিতে পড়েন ডিফেন্সের মূল ভরসা এবং মিসর ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে হেডে গোল করা ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। ফলে তাকেও মাঠ ছাড়তে হয়। এতে ২০২২-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ডিফেন্সে যে ফাটল ধরে তা আর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। রোমেরোর বিদায়ের কিছুক্ষণ পরই গোল হজম করে আর্জেন্টিনা। যা আর শোধ দিতে পারেনি। উল্লেখ, কেপ ভার্দের বিপক্ষে রোমেরো হেডে গোল করলেও রেফারি তা আত্মঘাতী বলে নোট করেন।
স্পেন যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছে। আর্জেন্টিনা যেভাবে খেলেছিল, তাতে তারা যদি কোনোভাবে একটি গোল দিয়ে ম্যাচ জিতে যেত বা টাইব্রেকারে জয় পেত তাহলে তা হতো অন্যায়। বল দখলের শারীরিক লড়াইয়ে কোনোভাবেই কুলিয়ে উঠতে পারেনি স্পেনের খেলোয়াড়দের সাথে। আর্জেন্টিনার ওলে পত্রিকার সাংবাদিক দিয়েগো মাসিয়াসের মতে, ‘স্পেন তো আমাদের চেয়ে ভালো ফুটবল খেলেছে। আর্জেন্টিনা খেলতেই পারেনি। আমাদের ফুটবলাররা ক্লান্ত ছিল। তার ওপর দুই খেলোয়াড়ের ইনজুরিতে মাঠ ত্যাগ আর ১০ জনে পরিণত হওয়া সবই শেষ করে দিয়েছে। মেসিও সেভাবে খেলতে পারেননি।’
চারটি বিশ্বকাপের ফাইনালে হারলো আর্জেন্টিনা। ১৯৩০ সাল। এরপর ১৯৯০, ২০১৪ এবং এবার। এবার ফাইনালে হারের ক্ষেত্রে ১৯৯০-এর ফাইনালের সাথে মিল ছিল। সেবার তারা পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরেছিল ৯ খেলোয়াড় নিয়ে। তাদের দুই ফুটবলার লাল কার্ড পেয়েছিলেন। আর ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো এবারো তাদের হারতে হলো অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে। সেবার জার্মানির বিপক্ষে তারা গোলের চান্স মিস করেছিল একাধিক। তবে এবার স্পেনের গোলরক্ষককে একটিবারের জন্যও পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি। সুতরাং এই দল কিভাবে চ্যাম্পিয়ন হবে।
তা ছাড়া কোচ স্কালোনির একাদশ নির্বাচন এবং মেসিকে মিডফিল্ডে না খেলিয়ে একা একা ওপরে রাখার কৌশলও ভুল ছিল।



