সাক্ষাৎকার : মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম

পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি নির্মাণের ঐতিহাসিক সুযোগ

শুধু কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) একীভূত করলেই সফল প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার ব্যবসায়িক দর্শন, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, শরিয়াহ গভর্ন্যান্স, নেতৃত্ব, মানবসম্পদ ও কর্মসংস্কৃতির মাধ্যমে। তাই প্রযুক্তি নির্বাচনের আগে নতুন প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, পরিচালন কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ জরুরি।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বিশিষ্ট ব্যাংকার ও আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভবনকে শুধু প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি নতুন ও শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি নির্মাণের ঐতিহাসিক সুযোগ।

তার মতে, শুধু কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) একীভূত করলেই সফল প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার ব্যবসায়িক দর্শন, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, শরিয়াহ গভর্ন্যান্স, নেতৃত্ব, মানবসম্পদ ও কর্মসংস্কৃতির মাধ্যমে। তাই প্রযুক্তি নির্বাচনের আগে নতুন প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, পরিচালন কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ জরুরি।

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ও নাইজেরিয়ার জাজেস ব্যাংকের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব নুরুল ইসলাম নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। তার মূল বার্তা হলো- প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহায়ক, কিন্তু দূরদর্শী নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দর্শন ও সুশাসনই একটি জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ভিত্তি।

নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-

প্রশ্ন: পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভবনকে কেন ঐতিহাসিক উদ্যোগ বলা হচ্ছে?

নুরুল ইসলাম : কারণ এটি শুধু পাঁচটি ব্যাংককে একত্র করার বিষয় নয়; বরং দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি নতুন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়ার সুযোগ।

প্রশ্ন : এই একীভবনের মূল লক্ষ্য কী হওয়া উচিত?

নুরুল ইসলাম : লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সম্পূর্ণ নতুন, দক্ষ, সুশাসিত ও টেকসই ইসলামী ব্যাংক গড়ে তোলা। শুধু বিদ্যমান পাঁচটি ব্যাংককে প্রশাসনিকভাবে একত্র করাই যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন : শুধু কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) এক করলেই কি সফল একীভবন হবে?

নুরুল ইসলাম: না। একটি সফটওয়্যার লেনদেন ও হিসাব পরিচালনা করতে পারে, কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় গড়ে ওঠে তার মূল্যবোধ, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, শরিয়াহ গভর্ন্যান্স, নেতৃত্ব ও কর্মসংস্কৃতির মাধ্যমে।

প্রশ্ন : তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনটি?

নুরুল ইসলাম: কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো- নতুন ব্যাংকের ব্যবসায়িক দর্শন, পরিচালন কাঠামো, গ্রাহকসেবা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল কি হবে, তা নির্ধারণ করা।

প্রশ্ন : এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা কী?

নুরুল ইসলাম: প্রযুক্তি হলো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম। এটি কখনোই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বা পরিচয়ের বিকল্প নয়।

প্রশ্ন : এই একীভবন কি শুধু প্রযুক্তিগত প্রকল্প?

নুরুল ইসলাম: না। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর। এর সাথে আইনগত সমন্বয়, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, তথ্য একীভূতকরণ, সাইবার নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া ও সাংগঠনিক সংস্কারের বিষয়ও জড়িত।

প্রশ্ন : এ বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ড) ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

নুরুল ইসলাম : বোর্ডের কাজ সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়; বরং সঠিক প্রশ্ন করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

প্রশ্ন : বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ করলে কি বোর্ডের কর্তৃত্ব কমে যায়?

নুরুল ইসলাম: না। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করলে সিদ্ধান্ত আরো তথ্যভিত্তিক ও শক্তিশালী হয় এবং বোর্ডের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

প্রশ্ন : এই একীভবনের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব কী?

নুরুল ইসলাম: এটি আগামী কয়েক দশকের জন্য বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের একটি নতুন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়ে দিতে পারে। তাই সিদ্ধান্তগুলো হতে হবে সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত।

প্রশ্ন : এ বিষয়ে আপনার মূল বার্তা কি?

নুরুল ইসলাম: একটি সফটওয়্যার একটি ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, কিন্তু একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে দূরদর্শী নেতৃত্ব, সুশাসন, সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দর্শন ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে। প্রযুক্তি এই যাত্রার সহযাত্রী- পথপ্রদর্শক নয়।