বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়

Printed Edition
ব্রাজিলকে শেষ ষোলতে জোড়া গোল করে বিদায় করে সতীর্থদের নিয়ে উল্লাস নরওয়ের গোল মেশিন আর্লিং হলান্ডের  : ইন্টারনেট
ব্রাজিলকে শেষ ষোলতে জোড়া গোল করে বিদায় করে সতীর্থদের নিয়ে উল্লাস নরওয়ের গোল মেশিন আর্লিং হলান্ডের : ইন্টারনেট

রেকর্ডটা অতি পুরাতন। নরওয়েই এক মাত্র দেশ যাদের বিপক্ষে কখনই জিততে পারেনি ব্রাজিল। সেই ১৯৮৮ সাল থেকে দুই দলের সাক্ষাৎ। তা ফিফা প্রীতিম্যাচ ও বিশ্বকাপ মিলে। এবার হয়তো আশা ছিল ব্রাজিলের বিশ্বকাপের লাকি গ্রাউন্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে প্রতীক্ষার অবসান হবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির ম্যাট লাইফ স্টেডিয়ামে গত পরশু রাতে এই দুই দলের মোকাবেলা হওয়ার আগ পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের আলোকে এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। তারা আগের চার ম্যাচের কোনোটিতেই হারেনি। অন্য দিকে নরওয়ে গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের কাছে হেরেছিল। কিন্তু শেষ ১৬-এর এই ম্যাচে সব ধারণা-অনুমান এবং বাজির ঘোড়া সবই পাল্টে দিয়েছে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশটি। ল্যাটিন দেশটির বিপক্ষে শতভাগ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রাখল তারা। ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেছে নরওয়ে। নেইমার-ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের এই বিদায় পর্ব সম্পন্ন হয়েছে আর্লিং হলান্ডের জোড়া গোলে। ফলে ব্রাজিল যেখানে এখন দেশে ফেরার বিমানে উঠবে, সেখানে নওরোজিয়ানরা শেষ আটের ম্যাচে ইংল্যান্ডের অপেক্ষায়।

একটি দলকে জেতানোর জন্য ওপরে একজন কুশলী এবং দক্ষ স্ট্রাইকার দরকার। আর নিচে দুর্ভেদ্য রক্ষণপ্রাচীর ও পেছনে আস্থাশীল গোলরক্ষক। নরওয়ের পোস্টের নিচে স্প্যানিশ লিগের সেভিয়াতে খেলা ওরজান হাকসজড নেইল্যান্ড। আর ফরোয়ার্ড লাইনে ম্যানসিটির হলান্ড। এই দুই ‘ল্যান্ডের’ ওপর ভর করেই জয়ের বন্দরে পৌঁছেছে ইউরোপিয়ান দেশটি। ফলে বিশ্বকাপে পেলে-রোনালদোদের দেশের বিপক্ষে শতভাগ জয়ের বেকর্ড ধরে রেখে মোট জয়ের সংখ্যাকে ৩-এ উন্নীত করল তারা। উল্লেøখ্য, দুই দলের পাঁচ মোকাবেলায় তিন জয় নরওয়ের। বাকি দুই ম্যাচ ড্র। বিশ্বকাপে এর আগে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের মাঠে গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল তারা- যা তাদের সেবার নকআউটে নিয়ে গিয়েছিল।

ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের আশা নিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল ব্রাজিল। যে মাঠে ১৯৯৪ সালে চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। সেই ব্রাজিল দলে ছিলেন রোমারিও-বেবেতো, ডুঙ্গার মতো ফুটবলার। এবার কে ছিলেন সেলেকাওদের হাল ধরতে? প্রতিপক্ষ দলে যে হলান্ড-মানের স্ট্রাইকার ছিলেন, সে মানের কোনো স্ট্রাইকার কি ছিল কোচ কার্লো অ্যানচেলোত্তির হাতে! না ছিল না। তাহলে জয়টা ধরা দেবে কিভাবে। দুই ম্যাচে ভিনিসিয়াস উদ্ধার করেছেন। এক ম্যাচে কুনহা। আর জাপানের বিপক্ষে ইনজুরি টাইমে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির গোলে সেরা ৩২-এর বাধা অতিক্রম।

তবে নরওয়ের বিপক্ষে এই দায়িত্ব কেউ-ই নিতে পারেনি। পেনাল্টি মিস করেছে। সহজ গোলের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। বল পোস্টে লেগেছে। আর বিপরীতে ডিফেন্স লাইনে ফাটল। ব্রাজিলের দাপটের মুখে কাউন্টারে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল নরওয়ে। কারণ তারা জান তো তাদের আছে হলান্ড। সুযোগ পেলেই তিনি বল জালে পাঠাবেন। বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের গ্যাপের সুযোগ নিয়েই ৭৯ ও ৮৯ মিনিটে দুই গোল আদায় করেন হলান্ড। এতে এবারের বিশ্বকাপে তার গোলের সংখ্যা ৭। ধরে ফেলেছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে। তিনজনই এখন ৭ গোল নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জয়ের লড়াইয়ে।

অথচ ম্যাচটি হতে পারত ব্রাজিলের জয়োৎসবের উপলক্ষ। সেই মিশনে প্রথমেই ধাক্কা খেতে হয় পেনাল্টি মিসে। ১২ মিনিটে কুনহাকে ফাউল করেন নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আজের। রেফারি প্রথমে পেনাল্টি না দিলেও ব্রাজিল ফুটবলারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভিডিও রিপ্লে দেখে স্পট কিকের নির্দেশ দেন। ব্রাজিল ভক্তদের আশা ছিল এই স্পট কিক মিস হবে না। অথচ ব্রুনো গুইমারেসের শট বাম দিকে শরীর ফেলে আটকে দেন ওরজান হাকসজড নেইল্যান্ড।

এই পেনাল্টি ঠেকিয়ে আরো উজ্জীবিত ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন গোলরক্ষক। যে কারণে ৩০ মিনিটে মার্টিনেল্লি এবং ৪০ মিনিটে ভিনিসিয়াসের শটও প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে রুখে দেন নেইল্যান্ড। প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে ফাঁকায় থেকেও হেড করার জন্য বলে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি মার্টিনেল্লি। এর আগে ৩৬ মিনিটে হলান্ডের একটি চলন্ত বলে ফ্লিক অ্যালিসন বাকের সোজা যাওয়ায় বিপদ হয়নি।

৫৬ মিনিটে কুনহাকে তুলে টিনএজার এন্ড্রিককে নামান কোচ অ্যানচেলোত্তি। এই উঠতি ফরোয়ার্ডটির হিরো হয়ে যাওয়ার দারুণ সুযোগ ছিল। ৫৯ মিনিটে সুবর্ণ সুযোগটি নিজের ও ব্রাজিলের পায়ে কুড়াল মেরে নষ্ট করেন রিয়াল মাদ্রিদ থেকে লোনে ফরাসি ক্লাব লিওতে যাওয়া এই ফুটবলার। ভিনিসিয়াসের থ্রু পাস থেকে ফাঁকায় বল পান তিনি। সামনে শুধুই গোলরক্ষক। কিন্তু তিনি আগুয়ান নেইলান্ডকে না কাটিয়ে ডান পাশ দিয়ে প্লেসিং করেন। এতে বল লক্ষ্য মিস করে পোস্টের বদলে যায় বাইরে। ৬৩ মিনিটে গুইমারেসের শটে বাধা হয়ে দাঁড়ান নরওয়ের কিপার।

এই বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েই স্বরূপে ফেরে নরওয়ে। শুরু হয় হলান্ডকে দিয়ে গোল করানোর চেষ্টা। দু’টি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ৭৫ মিনিটে গোলের জন্য পোস্টে শট নেন আন্দ্রিয়াস সেজেলড্রাফ। তবে ব্রাজিল গোলরক্ষক তা গোল হতে দেননি। তবে ৪ মিনিট পরেই ব্রাজিলকে হতাশায় ডুবিয়ে গোলোৎসবে মেতে উঠে নওরোজিয়ানরা। বাম দিক থেকে সেজেলড্রপের ক্রসে কার্যত ফাঁকায় থাকা হলান্ড তার দীর্ঘ দেহের সুবিধা নিয়ে লাফিয়ে হেড করেন। সেই ড্রপ হেড আলিসনের সব বাধা ডিঙিয়ে চলে যায় জালে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিকেল এবং বাংলাদেশের রাতটা আসলে ব্রাজিলের ফুটবলের জন্য ছিল না। তা না হলে কেন এন্ড্রিকের আরেকটি প্রচেষ্টা এভাবে বিফলে যাবে। ৮৫ মিনিটে তিনি আরেকবার ব্যর্থ। এবার তার শট গোলরক্ষকের হাতে লেগে পোস্টে প্রতিহত হয়। পরের মিনিটেই ক্যাসেমিরোর স্বার্থপরতায় ম্যাচে ফেরা হলো না ব্রাজিলের। তিনি দুরূহ কোণ থেকে নিজে গোল করার চেষ্টা না করে যদি হালকা ক্রস করতেন তাহলে গোল হতে পারত। কারণ তখন নেইমার ও ভিনিসিয়াস গোল লাইনের কয়েক ফুট সামনে একেবারেই ফাঁকায়।

এই জেরই টানতে হলো ৮৯ মিনিটে। এবারো সেই আর্লিং হলান্ড ঝলক। বদলি হিসেবে নামা সেজেলেড্রপের লব থেকে বল পেয়ে এরপর বাম পায়ের শটে আলিসনকে পরাস্ত করেন হলান্ড। তিনি যখন পোস্টে শটটি নিচ্ছিলেন তখন তাকে বাধা দেয়ার কেউ-ই ছিল না। একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় বল ধরে এরপর ধীরে সুস্থে পোস্টে শট নেন।

এর আগেই ৬৭ মিনিটে নেইমারকে মাঠে নামান কোচ। কয়েকটি কর্নার কিক নেয়া ছাড়া আর কিছ্ইু করতে পারেননি। তবে ইনজুরি টাইমে ব্রাজিল যে পেনাল্টিটি পেয়েছে তা জালে পাঠিয়েছেন দক্ষতার সাথে। বক্সে ক্যাসিমিরো ফাউলের শিকার হলে এই পেনাল্টি। এই গোলটি ব্যবধান কমানো আর সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই হলো না ব্রাজিলের জন্য। এই হারের ফলে শিরোপা পুনরুদ্ধারে আরো চার বছর অপেক্ষা করতে হবে ব্রাজিলকে।