মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা
একসময় দেশীয় মাছ ও অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকত নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওর। বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের কারণে স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ছিল ‘মিনি সুন্দরবন’ নামে। সময়ের সাথে বদলে গেছে হাওরের চিত্র। কমেছে মাছের প্রাচুর্য ও পাখির আনাগোনা। তবে কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনের সম্ভাবনা এখনো ধরে রেখেছে ডিঙ্গাপোতা হাওর।
মোহনগঞ্জ শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে এ হাওরের অবস্থান। বর্ষায় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার একর এলাকাজুড়ে থইথই করে পানি। চার দিকে জলরাশি, নৌকা ও সবুজের সমারোহে তখন হাওরটি হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন মানুষ।
ডিঙ্গাপোতা হাওরের ওপর নির্ভরশীল মোহনগঞ্জ উপজেলার বড়তলী, বানিহারী, তেতুলিয়া, মাঘান-সিয়াধার, শুয়াইর ও ঘাগলাজুর ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষ। হাওরের জমিতে উৎপাদিত বোরো ধান স্থানীয় খাদ্য চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, হাওরের প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। হেক্টরপ্রতি গড়ে ৬ থেকে ৭ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয় এখানে। তবে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় প্রতিবছরই পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয় কৃষকদের।
কৃষকদের অভিযোগ, ফসল রক্ষায় হাওরের বাঁধ ও রাস্তার টেকসই ব্যবস্থাপনা এখনো তৈরি করা হয়নি। সময়মতো বাঁধ সংস্কার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পাহাড়ি ঢলে পাকা ধান তলিয়ে কৃষকদের স্বপ্ন ভেসে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে।
প্রশাসন অবশ্য যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে উদ্যোগ নিচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিনা খাতুন জানান, হাওরের বিভিন্ন ফসলি জমির সাথে যোগাযোগ স্থাপনে বেশ কিছু রাস্তা পাকা করা হয়েছে। কাঁচা রাস্তার অনেকগুলো এলজিইডির আওতাভুক্ত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেগুলো পাকা করার উদ্যোগ নেয়া হবে।
ডিঙ্গাপোতা হাওরের আরেক সম্ভাবনাময় উৎস হলো মৎস্যসম্পদ। একসময় দেশীয় মাছের জন্য খ্যাতি থাকলেও অবৈধ জাল, অতিরিক্ত মাছ আহরণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার কারণে হাওরে মাছের বংশবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে অভিযান পরিচালনা করছে উপজেলা মৎস্য বিভাগ। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অনিক রহমান জানান, চলতি বছর মৎস্য বিভাগের অভিযানে প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের অবৈধ জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে।
কৃষি ও মৎস্যের পাশাপাশি পর্যটনেও রয়েছে অপার সম্ভাবনা। হাওরঘেঁষা আদর্শনগরে সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এর পরিচালক চৌধুরী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, সেখানে ১৪ জনের রাত্রিযাপন ও ৩০ জনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। হাওরের সৌন্দর্য উপভোগে পর্যটকদের আগ্রহও দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে ডিঙ্গাপোতা হাওর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা গেলে এটি কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা, দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম ও পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণের পাশাপাশি ফসল রক্ষায় টেকসই বাঁধ ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ও কৃষির বিপুল সম্ভাবনা ধারণ করে থাকা ‘মিনি সুন্দরবন’খ্যাত ডিঙ্গাপোতা হাওর এখন টেকসই পরিকল্পনার অপেক্ষায়। যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা গেলে এটি হয়ে উঠতে পারে নেত্রকোনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও কৃষিকেন্দ্র।



