একটি রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কেবল তার সীমান্তের কাঁটাতার বা অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং তা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষা দর্শনের ওপর। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যখন বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায়, তখন তার সামনে ছিল একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, অন্য দিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশাল আঞ্চলিক শক্তির ভূ-রাজনৈতিক চাপ। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশলের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা ছিল যুগপৎ সামরিক ও কূটনৈতিক। তাঁর দর্শন ছিল, কৌশলগত স্বাধীনতা (ঝঃৎধঃবমরপ অঁঃড়হড়সু)।
আজ ২০২৬ সালের বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে জিয়ার সেই প্রতিরক্ষা কৌশল নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।
১. পটভূমি : বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলায় প্রত্যাবর্তন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ এক চরম অনিশ্চয়তার আবর্তে পতিত হয়। সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছিল, গড়ে উঠেছিল সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তাঁর প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল সামরিক বাহিনীকে একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করা।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করা অসম্ভব। ফলে তিনি ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ পরবর্তী সময়ে বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনীকে একীভূত করেন। তিনি ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি সামরিক ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে একটি নিজস্ব কমান্ড কাঠামো তৈরি করেন, যা কেবল সীমান্ত রক্ষা নয়, বরং জাতি গঠনেও ভূমিকা রাখবে। জিয়ার সময়েই বাংলাদেশে প্রথম প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (উএঋও) এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ একাডেমি শক্তিশালী করা হয়, যা সামরিক বাহিনীকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
২. কৌশলগত ভারসাম্য : ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’
জিয়াউর রহমানের প্রতিরক্ষা কৌশলের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ ছিল তার পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, এটি বিশাল প্রতিবেশী ভারতের তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত। জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট বলয়ের ওপর (সেটি ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়ন যাই হোক) অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এই নির্ভরশীলতা কাটাতে তিনি কৌশলগত বহুমুখীকরণ নীতি (ঝঃৎধঃবমরপ উরাবৎংরভরপধঃরড়হ) গ্রহণ করেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা (ঝঅঅজঈ) প্রস্তাব করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে একটি বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভারসাম্য তৈরি করা, যাতে একক কোনো দেশ আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে।
৩. বহুমাত্রিক কূটনীতি ও চীনের সাথে সম্পর্কের সূচনা
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে দূরদর্শী পদক্ষেপ ছিল চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন। ১৯৭৫ সালের আগে চীনের সাথে বাংলাদেশের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন, ভারতের ওপর সামরিক সরঞ্জাম ও কৌশলগত নির্ভরতা কমাতে চীনের বিকল্প নেই।
এই সম্পর্কের ফলে বাংলাদেশ তার সামরিক হার্ডওয়্যারের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বিকল্প উৎস খুঁজে পায়। চীনের তৈরি ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং নৌ-জাহাজ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়নের প্রাথমিক রসদ জুগিয়েছিল। আজও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সিংহভাগই চীনের সরবরাহকৃত, যার বীজ রোপিত হয়েছিল জিয়ার সময়ে। এটি কেবল অস্ত্র ক্রয় ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বড় শক্তির পাশে দাঁড়িয়ে নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল।
৪. মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সংযোগ
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ওআইসি এবং ইসলামী বিশ্বের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এর ফলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সমর্থন আসেনি, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করেন। এই ত্রিমুখী ভারসাম্য-চীন, মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিম-বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য একটি ‘সুরক্ষা কবচ’ হিসেবে কাজ করেছিল।
৫. নৌ ও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন : নীল অর্থনীতির বীজ
বর্তমান সময়ে আমরা ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সমুদ্র নিরাপত্তা নিয়ে যে আলাপ করি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল জিয়ার আমলেই। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বঙ্গোপসাগর কেবল মাছ ধরার জায়গা নয়, এটি বাংলাদেশের ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ এবং বাণিজ্যের প্রাণরেখা। তার নির্দেশে নৌবাহিনীতে আধুনিক ফ্রিগেট সংযোজন এবং বিমান বাহিনীকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়ে বিরোধের সময় জিয়ার দৃঢ় অবস্থান প্রমাণ করেছিল যে, একটি ছোট রাষ্ট্রও যদি কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকে, তবে সে তার ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারে।
৬. সার্ক ও সমষ্টিক নিরাপত্তা দর্শন
জিয়াউর রহমান যখন দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক-এর ধারণা দেন, তখন সেটি কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য ছিল না। এর পেছনে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা মাত্রা (ঝবপঁৎরঃু উরসবহংরড়হ) ছিল।
* বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা বলয় : তিনি চেয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে, যেখানে দ্বিপক্ষীয় বিরোধগুলো (যেমন- ফারাক্কা বাঁধ বা সীমানা বিরোধ) বহুপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়। এটি ছিল ভারতের মতো বড় শক্তির একতরফা প্রভাব (ইরম ইৎড়ঃযবৎ ঝুহফৎড়সব) ঠেকানোর একটি কূটনৈতিক ঢাল।
* ছোট রাষ্ট্রগুলোর সংহতি : নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপকে সাথে নিয়ে একটি আঞ্চলিক ব্লক তৈরির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত গভীরতা (ঝঃৎধঃবমরপ উবঢ়ঃয) তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
৭. প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন ও অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির আধুনিকায়ন
একটি রাষ্ট্র ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত সার্বভৌমত্ব ভোগ করতে পারে না, যতক্ষণ তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমদানিনির্ভর থাকে। জিয়াউর রহমান এই সত্যটি অনুধাবন করেছিলেন।
* গাজীপুর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি (ইঙঋ): তাঁর সময়েই গাজীপুরের সমরাস্ত্র কারখানাকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ছোট অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। এটি ছিল ‘আত্মনির্ভরশীল প্রতিরক্ষা’ কৌশলের প্রথম পদক্ষেপ।
* প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা : সেনাবাহিনীর জন্য ‘ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ’ (উঝঈঝঈ) প্রতিষ্ঠা ছিল একটি মাইলফলক। এর ফলে বাংলাদেশের অফিসারদের উচ্চতর সামরিক শিক্ষার জন্য কেবল বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো না। এটি সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি নিজস্ব ‘মিলিটারি ডকট্রিন’ বা সামরিক দর্শন গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
৮. গোয়েন্দা কাঠামো ও কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের পুনর্গঠন
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপরও নির্ভরশীল। জিয়াউর রহমানের আমলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে যেভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছিল, তার প্রভাব আজও বিদ্যমান।
* ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর ক্ষমতায়ন : জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই)-কে তিনি শক্তিশালী প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামো প্রদান করেন। বিশেষ করে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ‘সাবভারসিভ অ্যাক্টিভিটি’ বা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড নস্যাৎ করতে তিনি কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স শাখাকে জোরদার করেন।
* অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন : স্বাধীনতার পর জাসদ গণবাহিনী বা অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। জিয়া কঠোর হাতে এই সশস্ত্র বিদ্রোহগুলো দমন করেন এবং একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
৯. বর্তমান বাংলাদেশে জিয়ার প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান বাংলাদেশে (২০২৬-এর প্রেক্ষাপট) এই কৌশলগুলোকে কার্যকর করতে গেলে কিছু নতুন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হবে :
ক. ‘সিল্ক রোড’ ও ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’-এর টানাপড়েন : বর্তমানে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং যুক্তরাষ্ট্র তার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) নিয়ে অত্যন্ত সক্রিয়। জিয়াউর রহমানের আমলে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে একমুখী। কিন্তু এখন তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, কিভাবে চীনের থেকে প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম নেয়া অব্যাহত রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখা যায়।
খ. নীল অর্থনীতি ও মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস : বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন ঘাঁটি (বিএএনএস শেখ হাসিনা) তৈরি এবং নৌবাহিনীর ‘টু-ফ্লিট নেভি’ হওয়ার লক্ষ্য মূলত জিয়ার সমুদ্র কৌশলেরই একটি ধারাবাহিকতা। তবে বর্তমান সময়ে এর সাথে যুক্ত হয়েছে সাইবার-মেরিটাইম সিকিউরিটি। বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবল রক্ষা এবং গ্যাস ব্লকগুলোর নিরাপত্তা এখন আমাদের প্রতিরক্ষা কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গ. নন-ট্র্যাডিশনাল সিকিউরিটি থ্রেট (এনটিএস) : জিয়ার সময়ে নিরাপত্তা ছিল মূলত রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র। কিন্তু এখন নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো হলো :
* জলবায়ু পরিবর্তন : সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল হুমকির মুখে পড়বে, যা অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
* সাইবার যুদ্ধ : ২০২৬ সালের বাস্তবতায় একটি দেশের ব্যাংকিং সেক্টর বা পাওয়ার গ্রিড অচল করে দেয়া একটি বড় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়েও ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
আজকের বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, কিন্তু এর নিরাপত্তা ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিয়ার কৌশলগুলো কেন প্রাসঙ্গিক, তা নিচের পয়েন্টগুলোতে বিশ্লেষণ করা হলো :
এক. ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশ : বর্তমানে বঙ্গোপসাগর বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (আইপিএস) এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর মধ্যে বাংলাদেশ একটি দোদুল্যমান অবস্থায় আছে। এই পরিস্থিতিতে জিয়ার সেই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্য নীতিই বাংলাদেশের জন্য একমাত্র পথ। কোনো এক পক্ষ নিলে বাংলাদেশ অন্য পক্ষের রোষানলে পড়তে পারে। জিয়ার দর্শন আমাদের শেখায় কিভাবে একাধিক বৈশ্বিক শক্তির সাথে জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে দরকষাকষি করতে হয়।
দুই. ভারত-চীন দ্বন্দ্ব ও কৌশলগত স্বাধীনতা : ভারত ও চীন- উভয় দেশই বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। ভারতের সাথে আমাদের নিরাপত্তা ও সংযোগের সম্পর্ক গভীর, অন্য দিকে চীনের সাথে প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক বিশাল। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ যে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখছে, তা মূলত জিয়ার প্রবর্তিত বহুমুখী কূটনীতিরই আধুনিক সংস্করণ।
তিন. রোহিঙ্গা সঙ্কট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা : মিয়ানমার সীমান্তে চলমান অস্থিরতা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। জিয়াউর রহমানের সময়েও (১৯৭৮ সালে) রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। তখন তিনি একদিকে সামরিক প্রস্তুতি রেখেছিলেন, অন্য দিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে মিয়ানমারকে শরণার্থীদের ফেরত নিতে বাধ্য করেছিলেন। বর্তমান সঙ্কটে জিয়ার সেই ‘ডিফেন্স-ডিপ্লোমেসি’ বা প্রতিরক্ষা-কূটনীতির সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
১০. আধুনিক চ্যালেঞ্জ : সাইবার যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা
জিয়ার সময়ে প্রতিরক্ষা মানে ছিল ট্যাংক, কামান আর সীমান্ত পাহারা। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রতিরক্ষার ধারণা পাল্টে গেছে। এখন সাইবার নিরাপত্তা, ডাটা সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলার সক্ষমতা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিয়ার ‘আত্মনির্ভরশীলতা’র দর্শনকে ডিজিটালাইজড করতে হবে। দেশের ডাটা সুরক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
১১. সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা
জিয়াউর রহমানের প্রতিরক্ষা কৌশলের সাফল্যের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করার যে ধারা তাঁর সময়ে শুরু হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের মধ্যে একধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছিল। অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার পরবর্তীকালে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
বর্তমান সময়ে একটি টেকসই প্রতিরক্ষা কৌশলের জন্য প্রয়োজন সামরিক বাহিনীর ওপর শক্তিশালী বেসামরিক তদারকি এবং গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা।
১২. রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার পুনর্মূল্যায়ন : আগামীর পথ
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশল এখন আর কেবল সেনা মোতায়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে আমাদের প্রয়োজন : ১. প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ : নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা। ২. জ্বালানি নিরাপত্তা : বঙ্গোপসাগরের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ৩. আঞ্চলিক নেতৃত্ব : দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি বজায় রাখতে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা।
জিয়াউর রহমান যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিলেন, তা ছিল ‘জাতীয়তাবাদ’। বর্তমান বাংলাদেশে এই জাতীয়তাবাদকে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি জাতীয় নিরাপত্তা মতবাদে রূপান্তর করতে হবে।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, জিয়াউর রহমানের প্রতিরক্ষা কৌশল কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের মতো একটি ভূ-বেষ্টিত ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের টিকে থাকার চিরন্তন ফর্মুলা। তার ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ এবং ‘বহুমাত্রিক কূটনীতি’ বর্তমানের অস্থির বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। ছোট রাষ্ট্র হয়েও বড় শক্তির চাপে পিষ্ট না হয়ে কিভাবে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হয়, জিয়ার প্রতিরক্ষা দর্শন তার একটি জীবন্ত পাঠ্যপুস্তক। বর্তমান বাংলাদেশে সেই দর্শনের আধুনিকায়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রয়োগই হতে পারে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।
জিয়ার প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যায়নি, বরং তার প্রয়োগের ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত হয়েছে। বড় শক্তির প্রক্সি হওয়ার বদলে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বজায় রাখাই হবে ২০২৬ এবং তার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের টিকে থাকার মূলমন্ত্র।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



