অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
তিন দিন টানা উন্নতির পর যথারীতি সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। আবার একই সময় কয়েকটি বড় মূলধনের কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি এগিয়ে রেখেছে বাজার সূচককে। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজার আচরণ বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে এক দিকে পুঁজিবাজারগুলোতে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানি ও ফান্ডের বেশির ভাগ যেখানে দরপতনের শিকার হয়েছে সেখানে বাজারগুলোর সব ক’টি সূচকই কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি ব্যাংক এবং লাফার্জ হোলসিম ও রবি অজিয়াটার মতো বড় মূলধনী কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি।
গতকাল লেনদেনের শুরুটা ছিল বেশ সাবলিল। উভয় বাজারই সূচকের বড় ধরনের উন্নতি দিয়ে দিন শুরু করে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচকটি ৫ হাজার ৯১১ দশমিক ২৪ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করে ১ ঘণ্টার ব্যবধানে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৯৬৭ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ৫৬ পয়েন্ট। সকাল থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত সূচকের এ অবস্থান ধরে রাখে বাজারটি। এখান থেকে সৃষ্টি হয় বিক্রয়চাপ। দুপুর ১২টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৯৩২ পয়েন্টে। পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সূচককে সাময়িকভাবে ঊর্ধ্বমুখী করলেও তা খুব একটা ফল দেয়নি। ৫ হাজার ৯১ দশমিক ২৪ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি ১৫ দশমিক ০৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রেখে লেনদেন শেষ করে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৮০ ও ১ দশমিক ৯১ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৮৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ১৫ হাজার ৭৭৮ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বুধবার দিনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ৮৬৪ দশমিক ০৫ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১১৮ দশমিক ৬১ ও ৬৩ দশমিক ০৫ পয়েন্ট।
সংশোধনের ফলে গতকাল দুই বাজারেই হ্রাস পায় লেনদেন। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ১ হাজার ৫১৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৩৬ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। অন্য দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার গতকাল ৩২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৬ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার সিএসইর লেনদেন ছিল ৭৮ কোটি টাকা।
গতকাল দুই বাজারেই সবগুলো খাতে কমবেশি সংশোধন ঘটে। তবে সংশোধনের সবচেয়ে বেশি শিকার ছিল টেক্সটাইল, বীমা, তথ্য-প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাত। মিশ্র প্রবণতা ছিল ওষুধ ও রসায়ন, সিমেন্ট ও সিরামিকস খাতে। দিনশেষে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া ৪০০ কোম্পানির ও ফান্ডের মধ্যে ১৩১টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২১৮টি। অপরিবর্তিত ছিল ৫১টির দর। অনুরূপভাবে চট্টগ্রামে লেনদেন হওয়া ২৫৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ১০০টির মূল্য বৃদ্ধির বিপরীতে দরপতনের শিকার ছিল ১২১টি। এখানে অপরিবর্তিত ছিল ৭৫টি সিকিউরিটিজের দর।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাচ্ছে। তাই এখন সূচকের স্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা যেমন থাকছে তেমনি বাজারে যথারীতি সংশোধনও ঘটে যাচ্ছে। এ ছাড়া পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক আচরণে দু-একটা স্ক্রিপ্টের ক্ষেত্রে কিছুটা অস্বাভাবিক থাকলেও তা পুরো বাজারকে প্রভাবিত করতে পারছে না। মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিই এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে টেকসই হয়ে উঠতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তারা। তবে তারা মনে করেন, এ অবস্থায় চাহিদার সাথে সমন্বয় রেখে বাজারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির কোন বিকল্প নেই।
এদিকে দেশের পুঁজিবাজারে তারল্য সঙ্কট কাটিয়ে লেনদেনে আরো গতি আনতে দীর্ঘদিনের আলোচিত ‘স্ক্রিপ নেটিং’ বা ‘ইন্ট্রাডে ট্রেডিং’, অর্থাৎ একই দিনে শেয়ার কেনা ও বিক্রির ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশনের ১০২০তম সভায় এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএসইসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন ব্যবস্থাকে আরো গতিশীল, দক্ষ ও আধুনিক করার লক্ষ্যে স্ক্রিপ নেটিং বা ইন্ট্রাডে ট্রেডিং চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে এ সুবিধা চালুর সম্মতি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সংস্থাটি শর্ত আরোপ করেছে যে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পরই দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ স্ক্রিপ নেটিং বা ইন্ট্রাডে ট্রেডিং কার্যক্রম চালু করতে পারবে।
বিএসইসির নেয়া এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, এর আগে ২০০০ সালের দিকে এ ধরনের নির্টিং ব্যবস্থা কার্যকর ছিল যার ফল খুব একটা ভালো হয়নি। এখন বিএসইসি চাইলে পরীক্ষামূলকভাবে ডিএসই-৩০ ও সিএসই-৩০ ইনডেক্সে থাকা স্ক্রিপ্টগুলো নিয়ে এ ব্যবস্থা চালু করে দেখতে পারে। যদি ভালো কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়াটি ভালো ফল দেয় তবে শুধুমাত্র ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে এটি কার্যকর করা যেতে পারে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিএসআরএম স্টিলস। ৩৭ কোটি ৪১ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৭ লাখ ১৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় ৫৬ লাখ ২৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মালেক স্পিনিং, লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, এসিআই ফরমুলেশন, রবি অজিয়াটা, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, লাভেলো আইসক্রিম ও সিটি ব্যাংক।



