জসিম উদ্দিন রানা
‘ম্যাচ উইনার’ ট্যাগটা আবারো নিজের করে নেন আমিরুল ইসলাম। টুর্নামেন্টে এ নিয়ে পাঁচ ম্যাচে চার হ্যাটট্রিক। এমন নজির নেই জুনিয়র বিশ্বকাপের ইতিহাসে। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন গোল, দ্বিতীয় ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তিন গোল, তৃতীয় ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে একটি, চতুর্থ ম্যাচে ওমানের বিপক্ষে দুর্দান্ত পাঁচ গোল এবং গতকাল আবারো কোরিয়ার বিপক্ষে তিন গোল দিয়ে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। আরো একটি মজার ব্যাপার হলো পাঁচ ম্যাচের মধ্যে তিন ম্যাচেই ম্যাচসেরা তিনি। মোট ১৫ গোল করে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। জুনিয়র ওয়ার্ল্ড কাপ হকির ইতিহাসেও এমন ধারাবাহিক স্কোরিংয়ের রূপকথা আর দেখা যায়নি। ৯ গোল দিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা স্পেনের আভিলা ব্রুনো এবং কোরিয়ার লি মিন হায়োক। ৯ বার ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা কোরিয়া ১৯৮৯ সালে চতুর্থ হয়েছিল। ২০০১ ও ২০০৯ সালে হয়েছিল সপ্তম। ২০০৫ ও ২০১৩ সালে অষ্টম হওয়া শক্তিশালী এই দলটিকে প্রথমবারের মতো হারাল বাংলাদেশ।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বেই নাটকীয় ম্যাচ উপহার দিয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম দুই কোয়ার্টারে ৩-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও শেষ দুই কোয়ার্টারে তিন গোল ফিরিয়ে দিয়ে দারুণ এক সমতা নিয়ে মাঠ ছাড়ে লাল-সবুজের যুবারা। সেই ম্যাচের রোমাঞ্চই যেন নতুন করে ছড়িয়ে দিলো পুল পর্বে। আবারো কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমে প্রথম কোয়ার্টারের মাঝামাঝি সময়েই গোল হজম করতে হয়। কিন্তু এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি আমিরুল-ওবায়দুল-রকিদের। কোরিয়াকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে আগামীকাল ১৭তম স্থানের জন্য মাদুরাইয়ে বিকেল সাড়ে ৪টায় লড়বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। দলীয় ২৬ গোল দিয়ে তালিকার তিনে সামিনরা। ৩১ গোল দিয়ে শীর্ষে ভারত ও ২৭ গোল দিয়ে স্পেন দ্বিতীয়।
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে পুরো ম্যাচের চিত্রটাই পাল্টে দেন বর্তমান জুনিয়র বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা আমিরুল ইসলাম। দারুণ এক ফিল্ড গোল করে সমতায় ফেরান দলকে। কিছু সময় পর পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে গোল করে বাংলাদেশকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন লাল-সবুজের এই গোলমেশিন। তৃতীয় কোয়ার্টারেও গোলের সুবাস ছড়ান আমিরুল। সার্কেলে ঢুকে অসাধারণ দক্ষতায় বাঁকানো শটে দলকে ৩-২ গোলে এগিয়ে দেন। নিজের ব্যক্তিগত প্রতিভা আর ম্যাচ রিডিং ক্ষমতা দিয়ে পুরো স্টেডিয়ামকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন এ তরুণ ফরোয়ার্ড। কোরিয়া তখন সমতায় ফিরতে মরিয়া থাকলেও বাংলাদেশের রক্ষণভাগ ছিল দুর্ভেদ্য। নাটকীয় চতুর্থ কোয়ার্টারে বাংলাদেশ দেখিয়েছে পরিণত হকির প্রতিচ্ছবি। কোরিয়ার আক্রমণ ঠেকিয়ে পাল্টা আক্রমণে জ্বলে ওঠেন ওবায়দুল জয়। দারুণ একটি বিল্ড-আপ থেকে গোল করে ব্যবধান বাড়ান। এরপর কোরিয়ার জালে শেষ পেরেকটি ঠুকেন রাকিবুল রকি। ৫-৩ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন সামিন বাহিনী। শেষ বাঁশি বাজতেই বাংলাদেশের ডাগআউট ফেটে পড়ে উচ্ছ্বাসে।
আমিরুলের প্রতিটি গোলই যেন নতুন আশার বার্তা। প্রতিবার বল স্টিকে নেয়া থেকে সার্কেলে ঢুকে শেষ মুহূর্তের স্পর্শ, সবকিছুতেই আছে আত্মবিশ্বাস, ঠাণ্ডা মাথা আর অদম্য ক্ষুধা। সতীর্থদের তৈরি করা বিল্ড-আপকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগানোর যে দক্ষতা, তা তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কোরিয়ার বিপক্ষে এই জয়ে বাংলাদেশ শুধু পয়েন্ট টেবিলেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেনি, বরং বিশ্বের বুকে জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ এখন আর হকির ছোট দল নয়। গতি, পাওয়ার, ট্যাকটিকস আর মনোবলে সমৃদ্ধ এই দলটি ভবিষ্যতে আরো বড় কিছু করার সামর্থ্য রাখে। আর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক তরুণ গোলমেশিন আমিরুল ইসলাম। তার নাম এখন জুনিয়র বিশ্বকাপের ইতিহাসের পাতায় সোনালি হরফে লেখা।


