নিজস্ব প্রতিবেদক
- বিচার ট্রাইব্যুনালে নাকি সেনা আইনে
- গত ১৬ বছরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে তার একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য
- মানবতাবিরোধী অপরাধের সময়কার সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে
- খতিয়ে দেখা হচ্ছে ১/১১-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সংশ্লিষ্টতা
সাবেক সেনাকর্মকর্তা মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে সেনা আইনে বিচারপ্রক্রিয়া চললেও তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তদন্তের স্বার্থে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। আগামী ২৩ জুলাই সকাল ১০টার মধ্যে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পর তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করবে প্রসিকিউশন। এরপর তদন্তের প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হবে। প্রয়োজনে তাকে এবং সাবেক সেনাকর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদও করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ আদেশ দেন।
আদেশের পর নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মোজাফফর হোসেনকে অতি সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানা গেছে, তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিষয়টি ভিন্ন। এখানে তার সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, এর আগে ১/১১-এর অন্যতম কুশীলব হিসেবে অভিযুক্ত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মিস কেসে গ্রেফতার করা হয়। সেই মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে তদন্ত সংস্থা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারীর (পিএ) কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে। সেই কল রেকর্ডে ‘জন ডো’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির সাথে নিয়মিত কথোপকথনের তথ্য পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, শুরুতে ‘জন ডো’ নামটি একটি ছদ্মনাম বা ভুয়া পরিচয় বলে মনে হয়। পরে তদন্ত সংস্থা বিষয়টি খতিয়ে দেখে জানতে পারে, ওই ব্যক্তি আর কেউ নন তিনি মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেন। তদন্তে আরো উঠে এসেছে, গত ১৬ বছরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও মোজাফফর হোসেনের মধ্যে বিভিন্ন সময় যোগাযোগ হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে যে মোজাফফর হোসেন একাধিকবার পার্শ্ববর্তী দেশে গেছেন, আবার বাংলাদেশেও এসেছেন। এই সময়ে তার সাথে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি দাবি করেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে তৎকালীন সরকারপ্রধানের সুসম্পর্ক ছিল এবং একাধিক নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে তার সম্পৃক্ততার তথ্যও তদন্তে এসেছে।
তিনি বলেন, তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার নানা তথ্য পেয়েছে। একই সময়ে, যখন দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, তখন মোজাফফর হোসেনের সাথেও তার যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। সেই কারণেই তদন্ত সংস্থার কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আমিনুল ইসলাম আরো বলেন, তদন্ত সংস্থার কাছে প্রাথমিক তথ্য এসেছে যে মোজাফফর হোসেনের মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। ১/১১-এর ঘটনাপ্রবাহের সাথেও তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য এসেছে। এ ছাড়া অন্য কোনো ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।
তিনি জানান, এই বিষয়গুলো উদ্ঘাটনের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তা তার কাছে আবেদন করেন। সেই আবেদনের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চাওয়া হয়; কারণ মোজাফফর হোসেন বর্তমানে সেনাবাহিনীর হেফাজতে আছেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন। আগামী ২৩ জুলাই তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে প্রসিকিউশন তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করবে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এমনকি তদন্তের স্বার্থে দু’জনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করারও প্রয়োজন হতে পারে। তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে পরে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা জানতে চান মোজাফফর হোসেন যেহেতু জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় অভিযুক্ত এবং সরকার বলেছে সেই বিচার সেনা আইনে হবে, তাহলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের সাথে কোনো সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে কিনা।
জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, দু’টি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, সেটির বিচার সেনা আইনে হবে। আর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত করছে মানবতাবিরোধী অপরাধে তার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। তাই দু’টি প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো সঙ্ঘাত নেই।
তিনি বলেন, তাদের তদন্তের মূল বিষয় হলো- গত ১৬ বছরে তৎকালীন সরকারের সাথে মোজাফফর হোসেনের সম্পর্ক কী ছিল, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে তার যোগাযোগের প্রকৃতি কী ছিল এবং একজন পলাতক ব্যক্তি হয়েও কিভাবে তিনি পার্শ্ববর্তী দেশে যাতায়াত করেছেন, বাংলাদেশে এসেছেন ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মতো একজন বিতর্কিত ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সময় তার ভূমিকা কী ছিল- এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই মুহূর্তে মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে নির্দিষ্ট কোনো মামলা নেই। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তবে ১/১১ থেকে শুরু করে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য তদন্ত সংস্থা পেয়েছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল এখনো তাকে গ্রেফতার দেখায়নি। আদালত কেবল তাকে হাজির করার জন্য প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেছেন। ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পর প্রসিকিউশন তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করবে। এরপর প্রয়োজন হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আলাদা আবেদন করা হবে।
‘জন ডো’ নামে কথোপকথনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তে দেখা গেছে মোজাফফর হোসেন ছদ্মনাম ব্যবহার করে যোগাযোগ করতেন। তবে কেবল কারো সাথে কথা বলা বা কোনো দেশে যাওয়া অপরাধ নয়; অপরাধ কী- সেটি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, তাদের কাছে প্রাথমিক (প্রাইমা ফেসি) তথ্য রয়েছে যে একজন পলাতক ব্যক্তি, যিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের একজন অভিযুক্ত, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের একটি সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ রেখেছেন। এই পরিস্থিতিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তের জন্য জরুরি।
ভারতের সাথে তার কোনো যোগাযোগের তথ্য তদন্তে এসেছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তের বাইরে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। তদন্ত সংস্থা শুধু এতটুকুই জানিয়েছে যে, গত ১৬ বছরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে মোজাফফর হোসেনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সেই যোগাযোগের প্রকৃতি এবং এর উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটিই এখন তদন্তের বিষয়।
তিনি আরো বলেন, তদন্তে যদি দেখা যায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে অন্য কারো একই ধরনের যোগাযোগ বা সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাহলে প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং প্রয়োজনে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদও করা হবে।
প্রায় ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গত সপ্তাহে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।
৪৫ বছরের পলাতক জীবন এবং ট্রাইব্যুনাল বনাম কোর্ট মার্শাল
তদন্ত নথি, ঐতিহাসিক বিবরণ এবং প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিদ্রোহী সেনাকর্মকর্তার অভিযানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। ওই ঘটনায় মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার পর সেনাবাহিনী বিদ্রোহ দমন করে, একাধিক সেনাকর্মকর্তার কোর্ট মার্শালে বিচার হয় এবং ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে মেজর মোজাফফরসহ কয়েকজন অভিযুক্ত দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
মোজাফফরের গ্রেফতারের পর তদন্তের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ঘটনায় তার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল? ঘটনার পর কিভাবে তিনি পালিয়ে যান? ৪৫ বছর কোথায় ছিলেন? এই সময়ে তাকে কেউ সহায়তা করেছিল কি না? এবং এত দীর্ঘ সময় পর উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও নথির গ্রহণযোগ্যতা আদালত কিভাবে মূল্যায়ন করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার ওপর নয়।
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক এখন বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে। এক পক্ষের যুক্তি, অভিযুক্ত যেহেতু সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন এবং ঘটনাটি সামরিক বিদ্রোহের সাথে সম্পর্কিত, তাই সেনা আইন, ১৯৫২ অনুযায়ী কোর্ট মার্শালেই বিচার হওয়া উচিত। অন্য দিকে প্রসিকিউশনের অবস্থান হলো, তদন্তে যদি মানবতাবিরোধী অপরাধের উপাদান প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনেই বিচার চলতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনা আইন মূলত সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ও সামরিক অপরাধের বিচার নিয়ে প্রণীত একটি বিশেষ প্রশাসনিক আইন। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) ১৯৭৩ গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত। সংশোধিত আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও বিচার চালানোর বিধান স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে দু’টি আইনের উদ্দেশ্য এক নয় এবং এখতিয়ার নির্ধারণে অভিযোগের প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- একই ঘটনার জন্য কি একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথক বিচার হতে পারে? বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদে একই অপরাধে একাধিকবার বিচার নিষিদ্ধ। তবে আইনজ্ঞদের মতে, যদি দু’টি অভিযোগের আইনগত উপাদান ভিন্ন হয়, যেমন একটি সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং অন্যটি মানবতাবিরোধী অপরাধ- তাহলে বিষয়টি আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করবে। এই প্রশ্ন ভবিষ্যতে উচ্চ আদালতের নীতিগত রায়ের বিষয়ও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় দেখা গেছে, সামরিক কর্মকর্তা হওয়া কোনো ব্যক্তিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বাইরে রাখে না। সাবেক যুগোস্লাভিয়া, রুয়ান্ডা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিভিন্ন মামলায় সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বেসামরিক বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সামরিক পরিচয় নিজে বিচার এড়ানোর ভিত্তি নয়; বরং অভিযোগের প্রকৃতি এবং আদালতের এখতিয়ারই মুখ্য বিষয়।
রাজনৈতিক ও বিচারিক গুরুত্ব
মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেনের গ্রেফতার কেবল একজন দীর্ঘদিনের পলাতক অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণও হতে পারে। এক দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার বহু বছরের অমীমাংসিত অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে, অন্য দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সামরিক বিচারব্যবস্থার এখতিয়ার নিয়ে একটি মৌলিক আইনি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে উচ্চ আদালতের ব্যাখ্যা এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি- মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো বিচারাধীন। অভ্যুত্থানের অপরাধে সেনা আইনে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। অন্য অনেক অভিযোগের তদন্ত শেষ হয়নি এবং আদালতও এখনো তার অন্য কোনো অপরাধ প্রমাণিত বলে ঘোষণা করেননি। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথি ও আইনগত যুক্তির ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে তার দায়, বিচারিক এখতিয়ার এবং ১৯৮১ সালের সেই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর কতটা উত্তর মিলবে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনাকর্মকর্তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান আগের দিন চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন দলের স্থানীয় বিরোধ মেটাতে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা, বয়ান বা বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে যাওয়া সশস্ত্র সেনাকর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মোজাফফর। জিয়াকে হত্যার মুহূর্তে তিনি তার কাছেই ছিলেন। জিয়াউর রহমান হত্যার পর মোজাফফর পালিয়ে যান এবং তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য তখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। জিয়া হত্যার পর ‘বিদ্রোহের’ অভিযোগে সামরিক আদালতে ১৮ সেনাকর্মকর্তার বিচার হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।



