সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রয়েছে যাত্রাবাড়ীর মামলা : চিফ প্রসিকিউটর

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত দ্রুত শেষ করে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, যাত্রাবাড়ীর ঘটনাগুলোকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর অন্যতম হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার সম্পন্নে ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে।

গতকাল রোববার যাত্রাবাড়ীর নবী টাওয়ারের কনফারেন্স রুমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যাত্রাবাড়ীর ঘটনাগুলোর তদন্ত এককভাবে নয়, সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পৃথক পৃথক হত্যা মামলা তদন্ত করলে বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ১৬, ১৯ ও ২০ জুলাইসহ বিভিন্ন দিনের ঘটনাগুলো দিনভিত্তিক একত্র করে একটি সমন্বিত তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিলের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একই বিচারে একাধিক ঘটনা ও একাধিক আসামিকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।

তিনি আরো জানান, প্রাথমিকভাবে যাত্রাবাড়ীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত প্রায় ৮৫ জনের নাম-পরিচয়সহ একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

চিফ প্রসিকিউটর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, থানায় থাকা তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো দ্রুত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে, যাতে একই সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত সম্পন্ন করা যায়।

শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রত্যেক শহীদ ও আহত পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল আন্তরিকভাবে কাজ করছে।

তিনি ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাদের কাছে ভিডিও ফুটেজ, ছবি, তথ্য বা অন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দিলে বিচার কার্যক্রম আরো দ্রুত এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে একাধিক মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজ বিচার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

‘১১ বন্ধু ফিরেছে, আমার ছেলে আর ফিরল না’

গণশুনানিতে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব ছেলের মৃত্যুর স্মৃতি তুলে ধরেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মিরাজরা ১১ বন্ধু সেদিন আন্দোলনে ছিল। সবার সন্তান তাদের মায়ের বুকে ফিরে গেল। আমার সন্তান আমার বুকে এলো না। ২৯ বছর বয়স ছিল। কি অপরাধ ছিল আমার মিরাজের? দেশকে ভালোবেসে প্রতিবাদ করতে গিয়ে জীবন দিয়ে গেছে।’

তিনি জানান, ৫ আগস্ট সকালে তার ছেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে আন্দোলনে অংশ নিতে যাত্রাবাড়ীর দিকে যায়। তিনি নিজেও ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিলেন। চারদিকে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও গুলির শব্দে পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেছিল। তার ভাষায়, পরিস্থিতি ছিল ‘কিয়ামতের আলামতের মতো’। তিনি নিজ হাতে বহু লাশ বহন করেছেন বলেও জানান। আবদুর রব বলেন, তার ছেলে যাত্রাবাড়ী থানার পাশের একটি গলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে ছিলেন এবং আর জীবিত ফিরে আসেননি।

গণশুনানিতে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা, ক্ষয়ক্ষতি, বিচার প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। উপস্থিত কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্য শোনেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন।

চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ গণশুনানিতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ, ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

আয়োজকদের ভাষ্য, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বক্তব্য সরাসরি শুনে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং তদন্তকে আরো কার্যকর করাই এ গণশুনানির মূল উদ্দেশ্য।