আলজাজিরা
বিশ্বমঞ্চে কথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ আর শান্তি আলোচনার বুলি জোরেশোরে চললেও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ঝরেই চলেছে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের রক্ত। যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে গাজার সাধারণ মানুষ ও শিশুদের জন্য একটি ‘নিষ্ঠুর ও মারাত্মক বিভ্রম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। এই বিভ্রমের বাস্তব রূপ ডানা মেলেছে গত শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে, যখন ইসরাইলি বিমান হামলায় গাজা শহরে একই পরিবারের চার সদস্যসহ অন্তত পাঁচজন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
চিকিৎসা সংবাদের বরাতে ফিলিস্তিনের ওয়াফা নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে (গ্রিনিচ মান সময় শুক্রবার রাত ২৩:০০টা) গাজা শহরের আল-থালাতিনি সড়কের একটি আবাসিক ভবনে কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই আচমকা রকেট হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এই বর্বর হামলায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এক বাবা ও তার দুই কন্যা চার বছর বয়সী জিনা এবং ১৪ বছর বয়সী লানা। হামলায় গুরুতর আহত মা চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সকালে মারা যান। হামলায় ওই পরিবারের আত্মীয় মোহাম্মদ সাফাদিসহ আরো বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আহত সাফাদি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ঘরে বসেছিলাম। কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই রকেটটি আমাদের ওপর এসে পড়ে। দখলদার বাহিনী ও মধ্যস্থতাকারীরা যে যুদ্ধবিরতির কথা বলে, এটা কি আসলেই সেই যুদ্ধবিরতি? আমরা সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, আমি কোনো দিন অস্ত্র হাতে তুলিনি।’ আলজাজিরার সংবাদদাতা তারেক আবু আজুম গাজা থেকে জানিয়েছেন, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বেসামরিক এলাকায় এই ধরনের হামলা চালানো এখন গাজাবাসীর নিত্যদিনের নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর একটি তাঁবু লক্ষ করে চালানো বিমান হামলায় আরো পাঁচজন আহত হয়েছেন এবং গাজার দক্ষিণ উপকূলে ইসরাইলি নৌযান থেকে ভারী গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
এ দিকে জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার গাজার শিশুদের ওপর চলা পদ্ধতিগত নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, মার্কিন মধ্যস্থতায় গত অক্টোবর মাসে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গত আট মাসে অন্তত ২৬৫টি ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। অর্থাৎ বৈরিতা অবসানের নাটকীয় ঘোষণার পরও গাজায় প্রতিদিন গড়ে একটি করে শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। এ ছাড়া এই সময়ে ইসরাইলি হামলায় ৪০০-রও বেশি শিশু গুরুতর আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে।
জেমস এল্ডার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্ব যখন শান্তি ও যুদ্ধবিরতির বুলি আওড়াচ্ছে, গাজার পরিবারগুলো তখন প্রতিদিন তাদের সন্তানদের লাশ দাফন করছে।’ তিনি জানান, গাজার শিশুরা আজ নিজেদের ঘর, বিদ্যালয় কিংবা খেলার মাঠের মতো সাধারণ জায়গাতেও নিরাপদ নয়। এমনকি ফুটবল খেলার সময়ও তাদের ওপর স্নাইপার ও ড্রোন থেকে হামলা চালানো হচ্ছে। ইসরাইলের দখলকৃত সীমানা ‘অরেঞ্জ লাইন’-এর কঠোরতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে ঘরের ভেতর থাকা অবস্থায় ড্রোন থেকে ছোড়া গুলিতে ৩ বছরের এক শিশুর মুখমণ্ডল ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়েছে।



