দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে গত এক দশকে দ্রুত বিস্তার ঘটেছে করপোরেট অ্যাগ্র্র্রিকালচার ও চুক্তিবদ্ধ চাষ বা কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ব্যবস্থার। বিশেষ করে পোল্ট্রি, ডেইরি ও ভুট্টা উৎপাদনে বড় বড় এগ্রো কোম্পানিগুলো কৃষকদের সাথে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। সরকার ও কোম্পানিগুলো একে আধুনিক কৃষির মডেল হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি কৃষকদের জন্য নতুন ধরনের নির্ভরশীলতা ও শোষণের কাঠামো তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুরুতে লাভের আশ্বাস দিয়ে চুক্তিতে যুক্ত করা হলেও পরে কোম্পানিগুলোর একতরফা শর্ত, নির্ধারিত খাদ্য ও ওষুধ কিনতে বাধ্য করা, উৎপাদিত পণ্য কম দামে নিতে চাপ সৃষ্টি এবং ঋণনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের স্বাধীনতা সীমিত করে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে ছোট ও মাঝারি স্বাধীন খামারিরা বাজারে টিকে থাকতে পারছেন না।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে তিন লাখের বেশি ছোট ও মাঝারি পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বড় কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ উৎপাদনে জড়িত। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) বলছে, ব্রয়লার উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ এখন করপোরেট নিয়ন্ত্রিত চেইনের আওতায় চলে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থায় কৃষক কাগজে-কলমে উদ্যোক্তা হলেও বাস্তবে কোম্পানির শ্রমিকে পরিণত হচ্ছেন। কারণ বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে বিক্রয় মূল্য পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে কোম্পানি।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের খামারি আবদুল কাদের নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রথমে কোম্পানি বলে লাভ হবে। তারা বাচ্চা দেয়, খাদ্য দেয়, ওষুধ দেয়। কিন্তু শেষে হিসাব করলে দেখা যায় লাভের চেয়ে দেনাই বেশি থাকে। বাজারে মুরগির দাম বাড়লেও আমরা সেই সুবিধা পাই না। তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানির নির্ধারিত ফিড ও মেডিসিন ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় বাজারের তুলনায় এসব পণ্যের দাম বেশি হয়। আবার মুরগির ওজন বা মৃত্যুহার নিয়ে নানা অজুহাতে কোম্পানি অর্থ কেটে নেয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চুক্তিবদ্ধ পোল্ট্রি খামারিদের প্রায় ৫৮ শতাংশ মনে করেন তারা উৎপাদনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। একই গবেষণায় বলা হয়, কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তির শর্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একতরফা এবং কৃষকদের দরকষাকষির সুযোগ সীমিত।
ডেইরি খাতেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তিবদ্ধ খামারি তৈরি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত খামারিরা নির্দিষ্ট মান ও দামে দুধ সরবরাহে বাধ্য থাকেন। কিন্তু খাদ্য, ভ্যাকসিন ও গবাদিপশুর চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেলেও অনেক সময় দুধের দাম সমন্বয় হয় না।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের দুগ্ধ খামারি আসাদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, দুধের দাম কোম্পানি ঠিক করে দেয়। কিন্তু গরুর খাদ্যের দাম প্রতিদিন বাড়ে। আমরা প্রতিবাদ করলে বলে চুক্তি বাতিল করে দেবে। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো প্রথমে সহজ শর্তে ঋণ বা উপকরণ দিলেও পরে সেই ঋণের চাপ ব্যবহার করে কৃষকদের বেঁধে ফেলে। ফলে কৃষক চাইলেও স্বাধীনভাবে বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারেন না।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায়, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৬৫ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়, যার বড় অংশ পোল্ট্রি ও ফিড শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এই খাতেও করপোরেট কোম্পানিগুলো চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কৃষকদের বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করে পরে নির্ধারিত দামে ভুট্টা কিনে নেয়া হয়।
সিরাজগঞ্জের কয়েকজন ভুট্টাচাষি জানান, বাজারদর বেশি থাকলেও চুক্তির কারণে তারা কম দামে কোম্পানিকে পণ্য দিতে বাধ্য হন। আবার ফসলের মান নিয়ে অভিযোগ তুলে অনেক সময় দাম কেটে রাখা হয়। তারা বলছেন, চুক্তিবদ্ধ কৃষি ব্যবস্থায় আইনি সুরক্ষা দুর্বল হওয়ায় কৃষকরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অধিকাংশ চুক্তিপত্র জটিল ভাষায় তৈরি হয় এবং কৃষকরা পুরো বিষয় বুঝতে পারেন না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে করপোরেট বিনিয়োগ উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হলেও নিয়ন্ত্রণহীন করপোরেট সম্প্রসারণ ছোট কৃষকদের বাজার থেকে সরিয়ে দিতে পারে।



