বুড়িগঙ্গা এখন বিষের নদী

আবুল কালাম
Printed Edition

  • প্রতিদিন নদীতে পড়ছে প্রায় ১২ লাখ ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য
  • অক্সিজেন প্রায় শূন্য, কালো পানির নিচে চাপা পড়ছে ঢাকার প্রাণপ্রবাহ

একসময় যে বুড়িগঙ্গা ছিল ঢাকার প্রাণ, বাণিজ্য ও সভ্যতার প্রধান জলপথ, সেই নদী আজ পরিণত হয়েছে বিষাক্ত বর্জ্যরে আধারে। শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক, নৌযানের তেল-মবিল এবং গৃহস্থালি আবর্জনার অব্যাহত আগ্রাসনে নদীটির অস্তিত্ব এখন চরম সঙ্কটের মুখে। পানির স্বচ্ছতা হারিয়ে বুড়িগঙ্গা আজ কুচকুচে কালো, আঠালো এবং দুর্গন্ধময়। নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অনেক স্থানে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, ফলে মাছসহ অধিকাংশ জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার পরিবেশ বিলীন হয়ে গেছে।

দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গবেষণায় বুড়িগঙ্গাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, নদীটির বর্তমান অবস্থা শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি), বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চের একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়াবহ এই চিত্র। গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন উৎস থেকে প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ছে।

গবেষণাগুলো বলছে, হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প আংশিক স্থানান্তরিত হলেও সাভার ও বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী টেক্সটাইল, ডাইং, ওয়াশিং এবং কেমিক্যাল কারখানার বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে মিশছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সদরঘাটকেন্দ্রিক নৌযান থেকে নির্গত পোড়া তেল, মবিল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য। রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, গৃহস্থালি বর্জ্য, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রাসায়নিক বর্জ্য এবং নদীতীরবর্তী অপরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থাও দূষণকে আরো তীব্র করেছে।

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বর্জ্যে ক্রোমিয়াম, সিসা, ক্যাডমিয়াম, জিংক, সালফিউরিক অ্যাসিড এবং অন্যান্য ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। নদীর তলদেশে কয়েক ফুট পুরু পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যরে স্তর জমে গেছে। ফলে শুধু পানিই নয়, নদীর তীরবর্তী মাটি ও বাতাসও দূষিত হয়ে পড়ছে। আশপাশের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছেন।

২০২৪ সালের ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের নদীগুলোতে ১০ ধরনের ভারী ধাতুর দূষণের প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১১-২০২০ সময়ে দূষণের মাত্রা আগের দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বুড়িগঙ্গাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে ভারী ধাতু, কৃষি খাতে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক, খনন কার্যক্রম, ইলেকট্রোপ্লেটিং শিল্প, বস্ত্রশিল্প, কয়লাখনি এবং শিল্পবর্জ্যরে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দূষণ জলজ জীববৈচিত্র্য, মানবস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে ২০২২-২৩ সালে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) বুড়িগঙ্গার আটটি স্থানে বছরব্যাপী গবেষণা পরিচালনা করে। মিরপুর ব্রিজ, বছিলা ব্রিজ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, চাঁদনীঘাট, সদরঘাট, ধোলাইখাল এবং পোস্তগোলা ব্রিজ এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও), জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি), দৃশ্যমানতা, তাপমাত্রা, পিএইচ, বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা, ক্ষারত্ব এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিশ্লেষণ করা হয়।

ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদারের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, ছয় ঋতু মিলিয়ে বুড়িগঙ্গার আটটি স্থানে গড় দ্রবীভূত অক্সিজেন ছিল প্রতি লিটারে মাত্র ৩ দশমিক ০১ মিলিগ্রাম। কেবল বর্ষা ও শরৎকালে প্রয়োজনীয় মাত্রার অক্সিজেন পাওয়া গেছে। শীতকালে এ হার নেমে আসে মাত্র ০ দশমিক ৬৩ মিলিগ্রামে।

ড. কামরুজ্জামান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা নব্বইয়ের দশকেই তার খরস্রোতা রূপ হারিয়েছে। এখন এটি মূলত দূষণের নদীতে পরিণত হয়েছে। অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থের কারণে প্রতিনিয়ত নদীর পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে।’

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গার গড় বিওডি প্রতি লিটারে ১০৭ দশমিক ৯৪ মিলিগ্রাম, যা সহনীয় মাত্রার প্রায় ১৮ গুণ বেশি। বসন্তকালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১৭ দশমিক ৫০ মিলিগ্রামে, যা নির্ধারিত মানের প্রায় ৩৬ গুণ বেশি। দূষণের এই মাত্রার কারণে নদীর কোনো অংশই মাছ চাষের উপযোগী নয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে জরুরিভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতের মতে, নদী পুনরুদ্ধারে তিনটি পদক্ষেপ একসাথে নিতে হবে- নদীর তলদেশ থেকে আবর্জনা অপসারণ করে গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি, শিল্প ও নগর বর্জ্যরে শতভাগ পরিশোধন নিশ্চিত করা এবং বুড়িগঙ্গার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা। তার ভাষায়, ‘ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও গঙ্গা অববাহিকা থেকে বুড়িগঙ্গা যে প্রাকৃতিক প্রবাহ পেত, তা ফিরিয়ে আনতে পারলে নদী ধীরে ধীরে নিজস্ব সক্ষমতায় পুনর্জীবিত হতে পারে। তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।’ বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী এই নদী ভবিষ্যতে সম্পূর্ণভাবে জীবন্ত জলধারার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলতে পারে। তখন বুড়িগঙ্গা শুধু একটি দূষিত জলাশয়ের নাম হয়েই ইতিহাসে টিকে থাকবে।