সভ্য পৃথিবীর প্রথম ভাষা কবিতা

Printed Edition

মামুন সুলতান

কবিতা একটি শিল্প। সুন্দর সুকৃতি। মনোবৃত্তির বিনয়ে নির্মিত শব্দমিনার। ব্যাকুল ভাবনার মিতব্যয়ী মিথষ্ক্রিয়া। অন্তরের অতৃপ্তির প্রকাশ। কবিতা সুন্দর, কবিতা মাতৃদুগ্ধের স্বাদ, কবিতা সমুদ্রের ঢেউ, কবিতা মুক্ত আকাশে নীলাম্বরী চোখ। কবিতা মক্তবের চুলখোলা আয়েশা আক্তার। এভাবে অনেক কথা বলা যাবে তবু কবিতা নিগূঢ় রহস্যে বসবাসকারী অস্পৃশ্য নারী। বলা যাবে অনেক কথা, কবিতার গুণাঞ্চলে তবু অবগুণ্ঠিত এক অপ্সরী মাথা নত করে থাকে। আলোর ঝিলিম থেকে চোখ তোলে না। ঝিনুকের ভেতরে মুক্তার মতো লুকিয়ে থাকা কবিতার আজন্ম অভ্যাস। তাই শিল্পমন বহুভুবনে সঞ্চার করে। পরিভ্রমণে বের হয় কবিমন। ভাবনায় পাড়ি জমান ‘দেশ হতে দেশান্তরে, দ্যুলোকে-ভূলোকে ঘুরে বেড়ান, ‘ভাঙ ভাঙ ভাঙ কারা’-বলে রবির কিরণে হাসি ছড়ান।

কবিতা একটি বহতা নদী। স্রোত কবিতার ছন্দ বা গতি। ঢেউ কবিতার শব্দ। সমুদ্রের সৌন্দর্য কবিতার ভাববস্তু। এভাবে পাহাড়, পর্বত, জলাভূমি, মরুভূমি, বৃক্ষলতা গুল্ম, ফুল-ফল বাগান, প্রকৃতির ছত্রে ছত্রে কবিতা খুঁজে পাওয়া যায়। প্রকৃতির বিস্ময়কর সৌন্দর্য মানব হৃদয়ে আশ্চর্য প্রভাব ফেলে। মানব হৃদয় আনন্দে সুর তোলে। গেয়ে যায় হৃদয়জ অনুভূতি। অনুভব মুদ্রিত হয় শব্দের শ্লেটে। প্রকাশ পায় আত্মানুবাদ। তাই কবিতা।

মানুষ মাত্র-ই কবি। মানবজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে আশা-বেদনার বায়োস্কোপ। কারো জীবনের কথাগুলো শব্দে প্রাণময় হয় কারো কথাগুলো অমুদ্রিত থেকে যায়। জীবনের কথার ব্যঞ্জনা যখন শিল্পময় ধারায় প্রকাশ পায় তখন কবিতা জীবিত হয় পৃথিবীর অপর মানুষের চোখে। আপন কথাগুলো একটি বিশেষ ছকে বন্ধন হয়ে অপরের অন্তরে ঢেউ তোলে তখন-ই কবিতা সজীব হয়।

পৃথিবীতে মানুষ বেঁচে থাকে সংগ্রামে সঙ্ঘাতে। দ্বন্দ্বে দগ্ধ হয়ে সংক্ষুব্ধ হৃদয় তন্ত্রে বাজে বিদ্রোহের বাঁশি। আশাহীন বেদনার জোয়ার আসে দুঃখের নদীতে। কান্নার করুণ অশ্রু ধ্বনির দ্যুতি তো দোল খায় জীবন্ত শব্দসৌকর্যে। বেদনারা আশ্চর্য ভাষা পায় কবিতায়। তাই বলা যায় মানব হৃদয়ের গোপন কথাগুলো বলার বিশ্বস্ত বন্ধু কবিতা।

সভ্য পৃথিবীর প্রথম ভাষা কবিতা। তাই সাহিত্যের প্রথম প্রকাশ কবিতা। সারা পৃথিবীর সাহিত্য বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যে দৃষ্টিপাত করলে চোখের সামনে চলে আসে চর্যাপদ। বাংলা সাহিত্যের আদি ঐতিহ্য চর্যাপদ। চর্যাপদের ভাষা কবিতা। তাই বলি ‘কবিতা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সন্তান।

কবিতা নিয়ে অনেক কথা অনেক আয়োজন দেখি পণ্ডিত সমাজে। কবিতার পরিচয়ে নানা সংজ্ঞা দিলেও সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন কবিতার কোনো সংজ্ঞা নেই। কবিতা গণ্ডিহীন আপন পরিচয়ে উজ্জ্বল। কবিতা অমীমাংসিত রহস্যময় পৃথিবী। কবিতা চিরকালীন সতেজ সুন্দর চির যৌবনময় চিরসবুজ। কবিতা সুন্দরের প্রকাশ।

কবিতা বাস্তবের কোনো বয়ান নয়। শিল্পির অঙ্কিত কোনো ছবিও নয়; বরং একটি চিত্রপট পাঠক হৃদয়ে এক ধরনের এক কল্পিত কাহন। কবি বাস্তব জগতে বাস করে অবাস্তবের এক আশ্চর্য জগৎ কবিতায় প্রতিধ্বনি তৈরি করেন। সাধারণ ভাবকে অসাধারণ করে প্রকাশ করেন। অন্তরের কথাকে প্রত্যেকের ভাবনার সাথে মিশ্রণ করেন। কবি কল্পনার বিস্ময়কর চিন্তার সাহায্যে রসঘন মধুরতা সঞ্চার করেন। কবিতা শুধু ভাবনা নয় ভাবনার সারাংশ, কবির মিষ্টি অনুভূতিগুলো দুঃখ-বেদনার কথাগুলো আনন্দ রসে প্রসব করেন শব্দের জাদুময়তা দিয়ে।

সাধারণে যা সাধারণত দেখতে পান না কিংবা দেখার সুযোগ হয় না কবি তা-ই আপন মনের গভীর উপলব্ধি দিয়ে সেই সাধারণ কথাকেই অলঙ্কৃত করে শিল্পজ্ঞানে প্রকাশ করেন। তাই কবির জগত সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা। বাইরের জগতের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ বা আপন মনের ভাবনা-বেদনা কল্পনাকে যিনি অনুভূতি-স্নিগ্ধ ছন্দোবদ্ধ দেহ দান করতে পারেন তিনি-ই কবি।

কবি মাত্রই ধ্যানী। ষষ্ঠেন্দ্রীয় দ্বারা কবি পৃথিবী অনুভব করেন। তৃতীয় চোখ দিয়ে জগত দেখেন। জগতের ভেতরে আরো জগত আছে সেগুলোর ভেতরে কবি প্রবেশ করেন। খুঁজে আনেন পৃথিবীর রূপ-রস গন্ধ। কবি যা লেখেন তাই কবিতা।

কবিতা এমন একটি শিল্প এমন একটি সৃষ্টি যা সুন্দরতম অঙ্গ সৌষ্ঠবে গতি প্রাপ্ত হবে, শক্তিশালী অনুভবগুলো সংবেদনশীলতায় সুন্দরতম চিন্তায় প্রাণ খুঁজে পাবে অলৌকিক উষ্ণতায়। হৃদয়ে সঞ্চারি হবে আনন্দ আয়োজন। যতটুকু বলা যাবে, যতটুকু হৃদয়ে রস সঞ্চারণ করবে তার সারশিল্প সুন্দরতম প্রকাশ-ই কবিতার মাধুর্য। কবিতার শক্তি সর্বময়। কবিতার গন্তব্য সর্বত্র। কবিতা প্রাণে প্রাণে জীবনের কথকতা।

কবিতা রমণ কিংবা রমণীর মতো দেহ সর্বস্ব নয়; বরং রমণ-রমণীর সৌন্দর্য যতটুকু দেখা যায় তার চেয়েও বেশি সুন্দর। অনুভব সুন্দর। হৃদয়ে দোল খাওয়া সুন্দর।

কবি ও কবিতার আলাদা কোনো সত্তা নেই। নেই আলাদা কোনো বাড়িঘর। কবি ও কবিতা পারস্পরিক বোঝাপড়া করে সংসার সাজান। কবি ও কবিতার সংসারে যখন কালের গহ্বর থেকে শিল্প সন্তানেরা জেগে ওঠে তখন-ই কালোত্তীর্ণ হয় অবিনাশী কোনো সুন্দর সৃষ্টি। জগতে দৃশ্যমান হয় শত বছরের শতস্র সাহিত্যের চিরকালীন সৌকর্য। চিরসত্য হয়ে আসে কবির চেতনা প্রসূত কাব্যময়, ধ্বনিময়, ছন্দময়, বর্ণময় কোনো শিল্প প্রসূন।

কবিতা হলো মানব মনের ভাবনা, কল্পনা যখন অনুভূতি রঞ্জিত হয়ে যথাবিহীত শব্দ সম্ভারে বাস্তব সুষমামণ্ডিতা চিত্রাত্মক ও ছন্দোময় শিল্প সশব্দে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-

অন্তর হতে আহরি বচন

আনন্দলোকে করি বিরচন

গীতরসধারা করি সিঞ্চন

সংসার-ধূলিজালে।

কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন অন্যকথা ‘-সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি-কেননা হৃদয়ের কল্পনার এবং কল্পনার ভেতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য বিকীরণ তাদের সাহায্য করছে। সাহায্য করছে; কিন্তু সবাইকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভেতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্য প্রাপ্ত হয়; নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।’

সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ ‘কবিতা’ প্রবন্ধে উল্লেøখ করেছেন- ‘কবিতা এমন এক জিনিস, যা শরীর ও আত্মা সর্বস্ব দখল করে। কবিতা দখলকারী মানুষ এক অন্ধের মতো, যার আলোকময়তা আর সবার চেয়ে বেশি। কবিতা দখলকারী মানুষ এক নগ্নের মতো, যার আবরণ আর সবার চেয়ে মূল্যবান। মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা বুদ্ধি নয়, হৃদয় নয়-কল্পনা। কবিতা এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে এ জন্যই যে-কল্পনা তার পেছনে সবচেয়ে প্রধানভাবে উজ্জ্বলভাবে কাজ করে যায়।’

কবিতা প্রবন্ধের অন্যত্রে বলেছেন ‘-কবিতা মানে রূপান্তর, কবিতা মানে বদল, কবিতা মানে পরিবর্তন। কবিতা মানে অবৈকল্য নয়, কবিতা মানে তির্যকতা। কবিতা নয় বস্তুফলক, এমনকি কবিতা কল্পনাফলকও নয়। কবিতা বস্তুকে তো রূপান্তরিত করেই, এমনকি কল্পনাকেও পরিবর্তন করে। কবিতার সমস্ত কিছুই প্রতীক, শব্দ-ছন্দ চরণ চিত্রকল্প মিল-অনুপ্রাস যতি-ছেদ উপমা-উৎপ্রেক্ষা সব কিছুই প্রতীক।’

কবিতা সত্তার গভীরতম তল থেকে উত্থিত হয় সাহিত্যের আর কোনো মাধ্যম অত গভীরে যেতে পারি কিনা সন্দেহ। কবিতায় ধরা পড়ে এমন অনেক কিছু যা দৃশ্য জগতের অন্তর্গত আবার এমন অনেক কিছু যা অদৃশ্য জগতের অংশ। কবিতা একই সঙ্গে কাজ করে মনন, কল্পনা-অনুভূতি-উপলব্ধি-অভিজ্ঞতা নিয়ে, আবার এসবের অতীত নিয়েও প্রকাশিত হয়। দৃশ্য জগত ও অদৃশ্য জগত মিলেমিশে কবিতা অন্য এক সত্য জগত তৈরি করে। কবি হাসান হাফিজুর রহমান ‘কবিতার বিষয়বস্তু’-প্রবন্ধে কবিতার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন- ‘মূলত: কাব্যে যে বাস্তবতা ফুটে ওঠে তা এমনই সাধারণ সংবেদ্য যে, আমার বলে মনে হয় অথচ ঠিক যেন আমার নয়, পরের কিন্তু সম্পূর্ণ পরেরও তাকে বলা যায় না। হেসিওড ও শিলারের সঙ্গে একমত হয়ে এই বিশেষ বাস্তবতার স্বরূপ নির্দেশ করে বলা যায়। কবিতা হলো- ‘A forgetfulness of evils and truce from cares; এবং এ উৎসর্গিত আনন্দের কাছে। কারণ, The right art is that alone, which creates the highest enjoyment. কেউ একজন ঠিক মনে নেই, কবিতাকে ‘শোকের মলম’ বলেছেন। কবিতা চৈতন্যেরই এক প্রকার সৌন্দর্যমণ্ডিত অভিলাষী সুরেলা বহিঃপ্রকাশ।’

কবি আহমদ রফিক বলেন, ‘কবিতা অনুভূতিসজ্ঞাত রূপময় ভাবশিল্প। কারণ কবির গভীর অনুভূতির প্রকাশ লাবণ্যময় হয়ে ওঠে উপমা, রূপকল্প, ছন্দ ও আঙ্গিকের অসাধারণ প্রয়োগে।’

এবার ইংরেজি সাহিত্যে কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে কে কী ভাবছেন বা লিখেছেন তার সামান্য আলোকপাত করা যাক।

Coleridge লিখেছেন-Best words in the best order

Wordsworth বলেছেন-Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings emotions recollected in franquility.

Matthew ArnoldPoetry is at bottom a criticism of life under conditions fixed for such a criticism by the laws of poetic truth and poetic beauty.

T.S. Eliot বলেছেন Poetry is written with excellent words in excellent arrangement and excellent meter.

Shelley কবিতার স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছে- ‘..in general sense (it) may be defined as the expression of the imagination.

কবি-গল্পকার এডগার এ্যালান পো বলেছেন- It is the rhythmic creation of beauty-এই সংজ্ঞাগুলো ব্যাখ্যা করলে কবিতার পরিচয়, সংজ্ঞা, স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য এবং কবিতার উপযোগগুলো সুস্পষ্টভাবে ধারণা লাভ করা যায়। তবুও কবিতা অমীমাংসিত রহস্য।

কবিতা কী? এ প্রশ্নের জবাবের জন্য আসুন ঘুরে আসি কবিদের কাব্যকলার নকশিকাঁথায়। কবিতা জানার জন্য পড়তে পারি কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ এ কবিতার পিঠে পিঠে আছে কবিতার পরিচয়। কবি বিশ্বস্ততার সাথে উচ্চারণ করলেন-

‘জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা

কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।’

‘সত্য শব্দ’ আর ‘শস্যদানা’ কবিতা। সত্য বলা কঠিন, শস্য উৎপাদনও কঠিন। কবিরাও ভালোবাসেন কঠিন সত্যকে। শস্য উৎপাদনে কৃষকের যেমন- কঠোর শ্রমে আত্মনিবেদন করতে হয়, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে সত্য বলা যেমন কঠিন-কবিও একটি সার্থক কবিতার জন্য তেমন-ই শিল্পভাবনার মাঠে আত্মমগ্ন থাকতে হয় বলে কবিকেও এক কঠিন তপস্যার ভেতরে থাকতে হয়। তাই তো রবি ঠাকুর বলেছেন- ‘সত্য যে কঠিন কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’

কবিতা মানে-

সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা

সুপুরুষ ভালোবাসার সকুণ্ঠ সঙ্গীত কবিতা

জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি যুক্ত শব্দ কবিতা

রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ তার ‘দয়িতা কবিতা’ শিরোনামীয় কবিতায় কবিতাকে নানা আঙ্গিক থেকে ধরে এনেছেন। ভাষাবৈচিত্র্যে বিষয়াঙ্গিক বহুমাত্রিক প্রকৃতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কবিতাকে নিয়ে হেঁটেছেন হরিৎ ঘাসের দেশে, সবুজ আম্মার কাছে, পাথরের উপরে, মধ্যরাতে, কিংবা দূরতম নক্ষত্রে।

এখানে আবার প্রতীক্ষার ভেতরে কবিতার সন্ধান পেয়েছেন। তাই বলা যায় কবিতার কোনো নির্দিষ্ট রূপ নেই। কবিতা বহুরূপী।

কবি আল মাহমুদ ‘কবিতা এমন’ কবিতায় কবিতার কাব্যিক পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কবিতাকে দেখেছেন ‘কৈশোরের স্মৃতি’ হিসেবে, মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট। কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী,/ ভোরের আজান/ কিংবা নাড়ার দহন,/ কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর/ ইস্কুল পালানো সভা,/ স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান/ চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে/

নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।/

কবিতা চরের পাখি,/ কুড়ানো হাঁসের ডিম,/ গন্ধভরা ঘাস/ মøান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর / গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর/ কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুল খোলা/ আয়েশা আক্তার।’

আসলে কবিতার সংজ্ঞা বহুমাত্রিক। কবিতার নেই কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের বিষয়ভিত্তিক তান্ত্রিকতা। কবিতা অবাধ, কবিতা স্বাধীন। কবিতা ভাষার চিত্রল শব্দে শান বাঁধা পুকুরঘাট। কবিতা অলৌকিক ইজেলে আত্মার রঙমাখা রঙধনু। তাই কবিতার কোনো নির্ধারিত রঙ নেই। কবির রঙে কবিতা রঙিন। তাই কবিতা অবিনশ্বর। চিরকালীন সৌন্দর্য কবিতার শরীরে যৌবনের রঙ ধরে। কবিতার কোনো বাড়ন্ত বয়স নেই। চর্যাপদ আজো চর্যাপদ। এখনো সজীব এখনো আবৃত্তি হয় চর্যার গান। কিটস বলেছেন- পৃথিবীর কবিতা কখনো মরে না। কবিতা আসলে মরতে পারে না। পৃথিবীর কোনো বীরদর্পধারী কিংবা কোনো অত্যাচারী কবিতাকে পরাস্ত করতে পারেনি। পরাস্ত হয়নি নজরুলের কবিতা। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে ফিরে গেছে দুর্দান্ত ইংরেজ। বাংলা কবিতায় আজো উচ্চারিত হয় ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর, কিংবা ওই নতুনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখির ঝড় কিংবা আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’র মতো কালজয়ী কবিতার পঙ্ক্তিমালা। কবিতার অবিনাশী শক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলা সাহিত্য।