নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিএসইর প্রধান সূচক এখনো ছয় হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা বাজারের ভিত্তি শক্তিশালী থাকারই
ইঙ্গিত দেয়
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেন, উভয় ক্ষেত্রেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) দুই বাজারেই অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে। একই সাথে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। তবে বাজারসংশ্লিষ্টরা এটিকে বড় ধরনের নেতিবাচক সংকেত হিসেবে না দেখে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পর স্বাভাবিক দর সংশোধন বলে মনে করছেন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গত সপ্তাহজুড়ে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা ছিল। ওই সময় অনেক কোম্পানির শেয়ারদর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে নতুন সপ্তাহের শুরুতে একাংশ বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে বিক্রির চাপ কিছুটা বেড়ে সূচকে পতন দেখা দিলেও বাজারে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। বরং এটি একটি স্বাস্থ্যকর সংশোধন, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
তারা বলছেন, বর্তমানে বাজারে অস্বাভাবিক বিক্রির চাপ নেই এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্কও দেখা যাচ্ছে না। সাময়িক মূল্য সংশোধনের পর বাজার আবারো ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরতে পারে। বিশেষ করে ডিএসইর প্রধান সূচক এখনো ছয় হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা বাজারের ভিত্তি শক্তিশালী থাকারই ইঙ্গিত দেয়।
গতকাল ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪৪ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার ৮৫৫ দশমিক ৭২ পয়েন্টে নেমে এসেছে। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৯ দশমিক ০৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৯৭ দশমিক ৮০ পয়েন্টে। পাশাপাশি ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১৬ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট হারিয়ে অবস্থান করছে দুই হাজার ২১০ দশমিক ৭৪ পয়েন্টে।
গতকাল দিনভর ডিএসইতে মোট ৩৯২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে, ২৪৫টির দর কমেছে এবং ৪৯টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ লেনদেনে অংশ নেয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর কমেছে, যা বাজারে বিক্রির চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
এ দিকে লেনদেনের পরিমাণও কিছুটা কমেছে। গতকাল ডিএসইতে মোট এক হাজার ৭০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল এক হাজার ১১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে প্রায় ৪৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
অন্য দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। এদিন সিএসইতে মোট আট কোটি ৮২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের ১৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সিএসইতে মোট ২৩৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়। এর মধ্যে ৭৬টির দর বেড়েছে, ১৩৭টির কমেছে এবং ২৬টির দর অপরিবর্তিত ছিল। দিন শেষে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬৬ দশমিক ২২ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ৭৪৮ দশমিক ৫৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ কারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও কিছুটা প্রভাব বাজারে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্ক মনোভাব তৈরি করেছে। যদিও এর প্রভাব সীমিত এবং বাজারে বড় ধরনের আতঙ্ক বা অস্বাভাবিক বিক্রির চাপ এখনো দেখা যায়নি।
তারা বলছেন, পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পর মাঝেমধ্যে মূল্য সংশোধন হওয়া স্বাভাবিক। এ ধরনের সংশোধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্যায়িত কিছু শেয়ারের দর যৌক্তিক অবস্থানে ফিরে আসে এবং বাজারে নতুন করে ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে স্বাভাবিক বাজার আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
এ দিকে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে গত ১৫ জুলাই কোম্পানির কাছে চিঠি পাঠায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। এমন প্রেক্ষিতে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেয়ারদর বৃদ্ধির পেছনে কোনো ধরনের অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) নেই। অর্থাৎ কোম্পানির ব্যবসা, আর্থিক অবস্থা বা অন্য কোনো কার্যক্রমে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, যা সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ফরচুন সুজের শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত ১১ মে কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১২ টাকা ৮০ পয়সা, যা ১৫ জুলাই বেড়ে দাঁড়ায় ২১ টাকায়। ফলে দুই মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির শেয়ারের দাম প্রায় ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় কোম্পানির ব্যাখ্যা প্রকাশের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতনভাবে বিনিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
অন্য দিকে বাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরো আধুনিক ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫ সংশোধনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংশোধিত বিধিমালা বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে সুশৃঙ্খলতা, স্বচ্ছতা এবং টেকসই উন্নয়ন আরো জোরদার হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেনের গতি আগের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এখনো পর্যবেক্ষণমূলক অবস্থানে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে লভ্যাংশ ঘোষণা, করপোরেট ঘোষণা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এতে বাজারে অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনার পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে মৌলভিত্তিক শেয়ারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
ডিবিএ এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাজারে টেকসই ঊর্ধ্বমুখী ধারা ধরে রাখতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকেও সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, সুশাসন নিশ্চিত এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বচ্ছ তথ্য উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়লে বাজারে স্থিতিশীলতা আরো জোরদার হবে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিবাচক অগ্রগতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে উন্নতি অব্যাহত থাকলে পুঁজিবাজারেও এর ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদি ওঠা-নামাকে স্বাভাবিক বাজারচক্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করাই অধিকতর যৌক্তিক।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে মৌলভিত্তি শক্তিশালী অনেক কোম্পানির শেয়ার এখনো বিনিয়োগের উপযোগী অবস্থানে রয়েছে। তাই সাময়িক দরপতনে আতঙ্কিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবর্তে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগ করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। তারা আশা করছেন, ইতিবাচক অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিবেশ অব্যাহত থাকলে চলতি সপ্তাহেই ডিএসইর প্রধান সূচক আবারো ছয় হাজার পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করতে পারে।



