সেবার ভাসমান ঠিকানা ‘জীবনতরী’

Printed Edition
সেবার ভাসমান ঠিকানা ‘জীবনতরী’
সেবার ভাসমান ঠিকানা ‘জীবনতরী’

ওমর ফারুক কালীগঞ্জ (গাজীপুর)

নদীবেষ্টিত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা দীর্ঘদিন ধরেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। সামান্য চিকিৎসার জন্যও অনেককে ছুটতে হতো দূরবর্তী শহর কিংবা রাজধানী ঢাকায়। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি— সব কিছুর চাপ পড়ত নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। সেই বাস্তবতায় গাজীপুরের কালীগঞ্জে আশার আলো হয়ে উঠেছে ভাসমান হাসপাতাল ইমপ্যাক্ট ‘জীবনতরী’।

গত এক বছর ধরে উপজেলার পৌরসভার খাদ্যগুদাম সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীর ঘাটে নোঙর করে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালটি। বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় নদীপাড়ের হাজারো মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উদ্যোগে পরিচালিত এ ভাসমান হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে। এর আগে ১৯৯৩ সালের ২৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি ট্রাস্ট হিসেবে নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়ার কাজ করে আসছে ‘জীবনতরী’। কালীগঞ্জে এর আগে ২০১৩ ও ২০১৮ সালেও সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

সরেজমিনে দেখা যায়, রোগীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করে ভাসমান সিঁড়ি বেয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করছেন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এ হাসপাতালে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার, অপারেশন-পরবর্তী রোগীদের জন্য পৃথক কক্ষ, এক্স-রে ইউনিট, প্যাথলজি ল্যাব, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কক্ষ এবং বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য অপেক্ষমাণ কক্ষ। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য হাসপাতালের সাথে দু’টি স্পিডবোটও সংযুক্ত রয়েছে।

চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীরা জানান, আগে সামান্য চিকিৎসার জন্যও ঢাকায় যেতে হতো। এতে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময় নষ্ট হতো। এখন এলাকার কাছেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ পাওয়ায় ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এ সেবার চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘জীবনতরী’ কেবল একটি হাসপাতাল নয়; এটি স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কমানোর একটি কার্যকর উদ্যোগ। যেখানে স্থায়ী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা কঠিন, সেখানে ভাসমান হাসপাতাল প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই সমাধানের একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে।

ভাসমান হাসপাতালের প্রশাসক এ কে এম সহিদুল হক জানান, নাক-কান-গলা, টনসিল, চক্ষু, অর্থোপেডিক, ঠোঁটকাটা ও তালুকাটা রোগীদের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়ক সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ২০০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ভাসমান হাসপাতাল ‘জীবনতরী’ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে এটি মানবকল্যাণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’

স্বাস্থ্যসেবার নাগাল থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকা নদীপাড়ের মানুষের কাছে তাই ‘জীবনতরী’ এখন শুধু একটি হাসপাতাল নয়, বরং সুস্থ জীবনের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।