জাহাঙ্গীর আলম হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)
চার-পাঁচ দশক আগেও নরসুন্দা ছিল প্রবল খরস্রোতা এক নদ। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার কাওনা, আশুতিয়া, রামপুর, চরপুমদী বাজারসহ জেলা শহরের বিভিন্ন ঘাটে ভিড়ত পণ্যবাহী ছোট-বড় নৌকা। নরসুন্দা ছিল সে সময় পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু আশির দশকের পর থেকে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়েছে নরসুন্দা। এক দিকে প্রাকৃতিকভাবে ভরাট হওয়া, অপর দিকে দুই পাড় দখল ও দূষণ- সব মিলিয়ে নরসুন্দা এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, নরসুন্দা রক্ষায় ২০১২ সালে বড় একটি উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে নরসুন্দা নদ পুনর্বাসন ও পৌরসভাসংলগ্ন এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প নামে ওই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তৎকালীন এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। প্রথমে ৬৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন পায়। পরে তা বাড়িয়ে ১১০ কোটি টাকা করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় নদ খনন, দুই তীরে ওয়াকওয়ে ও দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও নেয়া হয়। এ কারণে নদীর দুই পাড় থেকে বহু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল।
কিন্তু সুষ্ঠু তদারকির অভাবে নির্মিত এই প্রকল্পের সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। নদের তীরের ওয়াকওয়ের অনেক স্থান ধসে পড়েছে। তীর রক্ষায় বসানো ব্লক সরে গেছে। প্রভাবশালী মহল নদের বিভিন্ন পয়েন্টে মাটি ও বর্জ্য ফেলা শুরু করে। কোথাও গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা, কোথাও বাগান তৈরি করে তীর দখলের চেষ্টা চলছে। খননের পরেও নাব্যতা সঙ্কট কাটেনি। বরং পানি প্রবাহ না থাকায় কচুরিপানা ও ময়লায় বর্তমানে নরসুন্দা যেন ময়লা ফেলার ভাগাড় ও মশার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সরজমিন দেখা যায়, জেলা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অংশে পানি একেবারেই স্থির। কোথাও কোথাও শুধু কচুরিপানার সবুজ চাদর। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চার দিকে। স্থানীরা বলছেন, নদী খননের নামে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার কোনো সুফল তারা পাননি।
জেলা পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো: জুয়েল জানান, নদ খনন করা হলেও তা পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর হয়নি। বরং আগের চেয়ে অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে হোসেনপুরের কাওনা ও চরজামাইল এলাকায় নরসুন্দার উৎসমুখে বাঁধ দেয়া হয়েছিল, যা এখনো অপসারণ করা হয়নি। ওই বাঁধ সরাতে না পারলে নদের নাব্যতা ফেরানো সম্ভব নয়।’ তিনি এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলজিইডি কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, প্রকল্পের কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য তৎকালীন সময়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তার প্রতিবেদন কখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
নদের পাড়ের মানুষেরা বলেন, এক সময়ের খরস্রোতা নদ আজ মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে শুধু স্মৃতিই হয়তো থেকে যাবে কিশোরগঞ্জের এই নদটিকে ঘিরে।


