সাতকানিয়া-বাঁশখালীতে নেমে যাচ্ছে পানি, ভেসে উঠছে ধ্বংসযজ্ঞ

দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে মানুষ

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো ও সাতকানিয়া সংবাদদাতা

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পর দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। পানি সরে যাওয়ার সাথে সাথে কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো খাতে শত কোটি টাকার বেশি ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র ভেসে উঠেছে। দুই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় সড়ক, কালভার্ট, স্লুইস গেট, কৃষিজমি, মাছের খামার ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘদিন পানিবন্দী থাকা মানুষ এখন ঘরবাড়ি পরিষ্কার, কাদা সরানো এবং নতুন করে জীবিকা গড়ার কঠিন সংগ্রামে নেমেছেন। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান শুরু করতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে।

সাতকানিয়া পৌরসভার উত্তর রামপুর, হাঙরমুখ, গাটিয়াডেঙ্গা ও সামিয়ারপাড়া এলাকায় ডলু নদীর ভয়াবহ ভাঙনে কয়েকশ’ মিটার সড়ক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙা অংশ দিয়ে এখনো নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকছে, ফলে এসব এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি নলুয়া-চৌধুরীহাট সড়কের একটি অংশও ভেঙে গেছে। অন্য দিকে সাঙ্গু নদীর ভাঙনে বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া এলাকায় কয়েকটি বসতঘর, একটি মসজিদ এবং সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছদাহা-দস্তিদারহাট সড়কের প্রায় ২০০ মিটার অংশ বন্যার তোড়ে বিলীন হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা ফকিরহাটের উত্তর পাশে সড়কের ওপর অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করে চলাচল করছেন। স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ডলু নদীর পাশের সামিয়ার পাড়ার প্রধান সড়কটি একাধিক স্থানে ভেঙে গেছে। এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার পাশাপাশি বন্যার পানিতে একাধিক বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ধসে পড়ায় মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৬০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৯৯৫ হেক্টর আউশ ধান, ৭৪০ হেক্টর শাকসবজি, ৮ হেক্টর পান, ১৬ হেক্টর পেঁপে বাগান এবং ৮০ হেক্টর অন্যান্য ফসলসহ মোট এক হাজার ৮৯৯ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২০ হাজারেরও বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং কৃষি খাতে প্রাথমিকভাবে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) জানিয়েছে, বন্যায় ২৬টি সড়কের প্রায় ১৩ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া চারটি কালভার্ট ও একটি স্লুইস গেট ভেঙে গেছে, যার প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা।

এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে জানান, অনেক এলাকায় এখনো পানি পুরোপুরি নামেনি, ফলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে পূর্ণাঙ্গ জরিপের মাধ্যমে চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণ করা হবে।

এবার বন্যার বড় ধাক্কা লেগেছে মৎস্য খাতে। উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৫৭৫ হেক্টর আয়তনের তিন হাজার ৫৫০টি পুকুর ও দিঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে ৮০৬ মেট্রিক টন পিন ফিস, প্রায় ১০ লাখ মাছের পোনা এবং বিপুল পরিমাণ চাষের মাছ ভেসে গেছে। এতে অবকাঠামো, মাছ ও পোনাসহ প্রায় ৩৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

মাদার্শা ইউনিয়নের তরুণ উদ্যোক্তা মো: আব্বাস উদ্দিন জানান, মাহালিয়ায় তার প্রজেক্টের সব মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি সহায়তা না পেলে আবারও মাছ চাষ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তানবীর আহসান জানান, এটি প্রাথমিক হিসাব, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে পুনরায় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হবে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো সংস্কার এবং কৃষক ও মৎস্যচাষিদের জন্য জরুরি সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা না হলে এ দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।

বাঁশখালী উপজেলায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ভেসে উঠছে।

নয়া দিগন্তের বাঁশখালী সংবাদদাতা জানান, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাটির ঘর, রাস্তা ও একাধিক স্লইসগেট ব্যাপকভাবে ভেঙে গেছে। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর জলকদর খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। প্রথম দফায় ২.৪ কিলোমিটার খনন করা হলেও পরবর্তীতে পুরো খাল খননে একটি বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। স্লুইসগেট সংস্কার নিয়েও বন্যার আগে আমি জাতীয় সংসদে বক্তব্য রেখেছি। দীর্ঘদিন খাল ও নদী খনন না হয়ে দখল হওয়ায় এই বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। ইনশা আল্লাহ, আমরা পরিকল্পিতভাবে এসব সমস্যা নিরসনে পদক্ষেপ গ্রহণ করব। আর বন্যাকবলিত মানুষের পুনর্বাসনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বাঁশখালী পরিদর্শনে দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী

দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি পুনর্বাসনে জোর দিচ্ছে। তিনি বলেন, ত্রাণ বিতরণে কোনো ধরনের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো রকম দুর্নীতি স্বজনপ্রীতিকে আমরা বরদাশত করব না।

গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নে বন্যার্তদের ত্রাণ বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

মন্ত্রী আরো বলেন, বন্যা প্লাবিত মানুষের ক্ষেত্রে কোনো রাজনীতি নাই। যারাই দুর্গত তাদেরকে ত্রাণ দিতে হবে। আর এ ধরনের কোনো অভিযোগ যদি আসে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব আমরা।

এরআগে খাল পরিদর্শন করে মন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল যে, আমরা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের এসব খালকে পুনঃখনন করব। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল কেটে যে বিপ্লব করেছিলেন। তখন খাদ্যে আমাদের ঘাটতি ছিল। এই খাল কাটার মাধ্যমে খাদ্য উদ্বৃত্ত হয়েছিল। সেই খাদ্য বিদেশে রফতানি করা হয়েছিল। আজকে আমি সরেজমিন দেখলাম, খাল কাটার ফলে অনেকখানি পানি নিষ্কাশন হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্যটা হচ্ছে, বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন যেমন হবে, শুকনা মৌসুমে পানি ধরে রাখব আমরা। খালের পাড় আমরা কাজে লাগাব।

তিনি আরো বলেন, খালের বাকি অংশটা যাতে সামনের শুকনা মৌসুমে সম্পন্ন করা যায় সেজন্য আমি আমার মন্ত্রণালয় থেকেও বরাদ্দ দেবো। খালটাকে আরো সুন্দর করার জন্য আমি নির্দেশনা দিয়ে গেলাম। আমাদের বাংলাদেশের ৫০টি জেলায় একটি মডেল খাল আমরা চিহ্নিত করব। আশা করি এই খালটাকেও আমরা মডেল খালের মধ্যে নিয়ে আসতে পারব। এরপর তিনি খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন।

এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা মাওলানা জহিরুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বান্দরবানে ঘরবাড়ি মেরামত করে দেয়া হবে

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুল বলেছেন, বন্যায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসন করা হবে। তাদের ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়িগুলো সরকারি উদ্যোগে সংস্কার করে দেয়া হবে। এ ছাড়া বন্যা ও জলাবদ্ধতা রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে সরকার। গতকাল বিকেলে বান্দরবানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। এর আগে সকালে বিদ্যুৎ জ্বালানি খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বালাঘাটা বাজারসংলগ্ন আমবাগান এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সাথে বান্দরবান ৩০০ নং আসনের সংসদ সদস্য সাচিং প্র“ জেরী, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাধবী মারমা, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো: জিয়াউদ্দিন, বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো: সানিউল ফেরদৌস, পুলিশ সুপার মো: ওহাবুল ইসলাম খন্দকারসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বন্যাপরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।