সাক্ষাৎকার : ড. আলী আফজাল

মূলধনী করারোপে আবাসনে নতুন সঙ্কট হতে পারে

বাংলাদেশের আবাসন খাত মূলত যৌথ উন্নয়ন ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জমির মালিকরা এটি শুধু জমির মালিকের সমস্যা নয়। এই অতিরিক্ত করের কারণে নতুন চুক্তিতে আগ্রহ হারান, তাহলে নতুন প্রকল্প কমে যাবে। নতুন প্রকল্প কমলে নির্মাণ কমবে, বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান কমবে। ফলে রড, সিমেন্ট, কাঁচ, সিরামিক, অ্যালুমিনিয়াম, বৈদ্যুতিক পণ্যসহ শত শত শিল্পখাতে ধস নামতে পারে। তাই এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক ইস্যু, শুধু একটি কর সংক্রান্ত বিষয় নয়। আর এই কর শেষ পর্যন্ত জমির মালিকরা ডেভেলপারদের ওপর চাপিয়ে দেবে। আর ডেভেলাপরদেরই হয়তো দিতে বাধ্য থাকতে হবে কারণ আমাদের জমির সঙ্কট। ব্যবসা করতে হলে জমির মালিকদের কথা শুনতেই হতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব আবাসন খাতে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এ প্রস্তাব পাস হলে আবাসন ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধন ট্যাক্স আরোপ একই সাথে নগর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। আবাসন ব্যসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এ খাতে ইতোমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ হয়ে গেছে, এই বিনিয়োগ তুলে আনতে এধরনের কর আরোপ সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে। এ ব্যাপারে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন, বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল।

নয়া দিগন্ত : ১৫ শতাংশ করের বিষয়ে আপনাদের মূল আপত্তি কোথায়, করের হার কিভাবে হিসাব করা হবে, জমির মালিক কিভাবে তা পরিশোধ করবেন?

ড. আলী আফজাল : ধরুন, ১০ কাঠা জমিতে একটি প্রকল্পে ২৪টি ফ্ল্যাট নির্মিত হলো। জমির মালিক এক কোটি টাকা সাইনিং মানি নিয়েছেন। এই এক কোটি টাকা সাইনিং মানির ওপর দিতে হবে ১৫ লাখ টাকা মূলধনী ট্যাক্স। অন্য দিকে ৫০ : ৫০ অনুপাতের চুক্তি অনুযায়ী ১২টি ফ্ল্যাট জমির মালিক পেলে ১২টি ফ্ল্যাট ডেভেলপার পাবেন। যদি প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য ১ কোটি টাকা ধরা হয়, তাহলে জমির মালিকের প্রাপ্য ফ্ল্যাটের মোট মূল্য দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকা। জমির মালিক যদি বিশ বছর আগে সেই জমি ৫০ লাখ টাকায় কিনে থাকেন তবে অর্জিত মূল্য বাবদ ১২ কোটির মধ্যে সেই ৫০ লাখ টাকা বাদ যাবে। অর্থাৎ তার সাড়ে ১১ কোটি টাকার ওপর যদি ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, তাহলে করের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ একজন জমির মালিককে শুধু কর পরিশোধের জন্য প্রায় দুইটি ফ্ল্যাটের সমপরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকের কাছে এটি অবাস্তব এবং অযৌক্তিক চাপ বলে মনে হচ্ছে। আমরা করের বিরোধিতা করছি না। প্রশ্ন হলো- কর আরোপের সময় ও পদ্ধতি। জমির মালিক যখন ফ্ল্যাট বুঝে পান, তখন তিনি কোনো নগদ অর্থ হাতে পান না। তিনি একটি স্থাবর সম্পদ পান। এই স্থাবর সম্পদ ফ্ল্যাটের ওপর অনির্ধারিত ও অবাস্তব কাগুজে মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হচ্ছে। জমির মালিকের জন্য এটি প্রকৃত আয় নয় বরং ভবিষ্যতে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর আগাম কর, এটা হতে পারে না, এটা অবাস্তব। সেই সম্পদ থেকে আয় হবে কি না, কবে হবে, আদৌ বিক্রি করবেন কি না সেটা ভবিষ্যতের বিষয়। কিন্তু কর দিতে হবে সাথে সাথে। অনেক জমির মালিক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, মধ্যবিত্ত পরিবার আবার অনেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক। তাদের জন্য একসাথে কোটি টাকার কর পরিশোধ করা বাস্তবসম্মত নয়।

নয়া দিগন্ত : সাইনিং মানির বিষয়টি নিয়ে রিহ্যাব বারবার কথা বলছে কেন? এটাতো একটি মীমাংসিত বিষয়, অনেক আগে থেকেই জমির মালিককে সাইনিং মানি দিতে হয়, ব্যাখ্যা করুন।

ড. আলী আফজাল : এটা জমি কেনাকাটার সাথে যারা জড়িতরাই কেবল জানেন, অনেকেই জানেন না। জমির মালিক যদি সাইনিং মানি পান, তাহলে সেই অর্থের ওপর বিদ্যমান আইনে ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স বা মূলধনী কর পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ সরকার ইতোমধ্যেই একটি পর্যায়ে রাজস্ব পাচ্ছে। বাস্তবে অনেক প্রকল্পে জমির মালিক কোনো সাইনিং মানিই পান না। তারা শুধু ভবিষ্যতে ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় চুক্তি করেন। যদি সাইনিং মানির ওপর করের পাশাপাশি ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময়ও নতুন করে ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, তাহলে এটি অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে মালিকের ওপর, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাইনিং মানির ওপর আরোপিত কর ডেভেলপারদেরই পরিশোধ করতে হচ্ছে। অপর দিকে জমির মালিকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন বলে তারা সংগঠিত নন, তবে আমরা লক্ষ করছি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই অনেক জমির মালিক আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। তারা ফোন করছেন, অফিসে আসছেন, মতবিনিময় করছেন। অনেকেই এখন হিসাব কষে বুঝতে চেষ্টা করছেন যে, তাদের ওপর কী ধরনের আর্থিক চাপ আসতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে এবং তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন।

নয়া দিগন্ত : এই কর কি শুধু জমির মালিকদের সমস্যা নাকি পুরো আবাসন খাতের সমস্যা?

ড. আলী আফজাল : বাংলাদেশের আবাসন খাত মূলত যৌথ উন্নয়ন ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জমির মালিকরা এটি শুধু জমির মালিকের সমস্যা নয়। এই অতিরিক্ত করের কারণে নতুন চুক্তিতে আগ্রহ হারান, তাহলে নতুন প্রকল্প কমে যাবে। নতুন প্রকল্প কমলে নির্মাণ কমবে, বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান কমবে। ফলে রড, সিমেন্ট, কাঁচ, সিরামিক, অ্যালুমিনিয়াম, বৈদ্যুতিক পণ্যসহ শত শত শিল্পখাতে ধস নামতে পারে। তাই এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক ইস্যু, শুধু একটি কর সংক্রান্ত বিষয় নয়। আর এই কর শেষ পর্যন্ত জমির মালিকরা ডেভেলপারদের ওপর চাপিয়ে দেবে। আর ডেভেলাপরদেরই হয়তো দিতে বাধ্য থাকতে হবে কারণ আমাদের জমির সঙ্কট। ব্যবসা করতে হলে জমির মালিকদের কথা শুনতেই হতে পারে।

নয়া দিগন্ত : সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপর এই মূলধনী কর কোনো প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এর সাথে ভাড়াটিয়াদের ওপরও চাপ পড়তে পারে, আপনাদের গবেষণা কী বলে?

ড. আলী আফজাল : শেষ পর্যন্ত সব ব্যয়ই বাজারে প্রতিফলিত হয়। যদি জমির মালিক ও ডেভেলপার উভয়ের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপানো হয়, তাহলে নতুন প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে। ব্যয় বাড়লে ফ্ল্যাটের বিক্রয় মূল্যও বাড়বে। অর্থাৎ আজ যে ব্যক্তি একটি ফ্ল্যাট কিনতে চান, তিনি ভবিষ্যতে আরো বেশি দাম দিতে বাধ্য হতে পারেন। তাই এই কর শুধু জমির মালিকের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ ফ্ল্যাট ক্রেতাদেরও ওপর নদুন ব্যয় চাপিয়ে দেবে। এবার ভাড়াটিয়াদের ব্যাপারে আসি। আমি বলব, অবশ্যই আবাসন বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যদি নতুন প্রকল্প কমে যায় এবং আবাসনের সরবরাহ হ্রাস পায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ভাড়া বৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আমরা ইতোমধ্যে বড় শহরগুলোতে আবাসনের ওপর চাপ দেখতে পাচ্ছি। নতুন ফ্ল্যাট নির্মাণ কমে গেলে সেই চাপ আরো বাড়বে। ফলে যারা আজ ভাড়া বাসায় থাকছেন, তারাও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, তাদের বেশি ভাড়ায় বাস করতে হতে পারে।

নয়া দিগন্ত : কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?

ড. আলী আফজাল : আবাসন খাত দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত। এই খাতের সাথে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৬৯টি শিল্প ও সেবাখাত জড়িত। একটি নতুন প্রকল্প শুরু হলে শুধু ডেভেলপার নয়, প্রকৌশলী, স্থপতি, নির্মাণ শ্রমিক, ঠিকাদার, সাব-কন্ট্রাক্টর, পরিবহন শ্রমিক, রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী, সিরামিক ও স্যানিটারি পণ্য উৎপাদনকারী, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহকারীসহ অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। যদি এই করের কারণে যৌথ উন্নয়নভিত্তিক নতুন প্রকল্প কমে যায়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি নির্মাণ কার্যক্রমের ওপর পড়বে। নির্মাণ কমে গেলে হাজার হাজার দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের কাজের সুযোগ কমে যাবে।

নয়া দিগন্ত : সরকারের কাছে আপনাদের প্রস্তাব কী?

ড. আলী আফজাল : আমাদের প্রস্তাব খুবই সরল। সরকার যদি রাজস্ব আদায় করতে চায়, তাহলে প্রকৃত মুনাফা অর্জনের সময় কর আরোপ করতে পারে। অর্থাৎ জমির মালিক যখন ফ্ল্যাট বিক্রি করে প্রকৃত আয় করবেন, তখন কর আদায় করা যেতে পারে। এতে সরকারও রাজস্ব পাবে এবং বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি হবে না। আমরা সরকারকে অনুরোধ করছি, বাজেট পাশের আগেই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হোক। এটি শুধু আবাসন খাতের নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, আবাসন ব্যয় এবং নগর উন্নয়নের প্রশ্ন। আমরা বিশ্বাস করি, আলোচনার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা সম্ভব।