মুহা: আবদুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো
পদ্মার তীরে বন্দর প্রস্তুত। নৌপথে নাব্যতাও রয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের ১০টি ট্রিপও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ১১টি সংস্থার মধ্যে ১০টির অনুমোদন পাওয়ার দাবিও রয়েছে। এরপরও পুরোপুরি চালু হচ্ছে না রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর।
বন্দরটি এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সফল পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের পরও একটি অনুমোদনের কারণে বন্দরটির নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম থমকে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালুর প্রক্রিয়া আসলে কোথায় আটকে আছে?
সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের মায়া বা ধুলিয়ান নৌবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। একসময় এ নৌপথ ছিল দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যম। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর নৌবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৫৯ বছর পর ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নৌপথটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে ভারত থেকে পাথর এবং বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্ট ঝুট পরিবহনের ১০টি ট্রিপ সম্পন্ন হয়। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলেও এরপর নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।
অবকাঠামো প্রস্তুত
সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালুর জন্য ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২৫ বছরের জন্য জমি ইজারা নিয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে প্রয়োজনীয় স্থাপনা। নৌযান চলাচল নির্বিঘœ রাখতে নাব্যতা নিশ্চিত করার জন্য ড্রেজিংও করা হয়েছে। বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নৌ-পুলিশ ফাঁড়িকে থানায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত জুনে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় বন্দরটি দ্রুত চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা হয়। তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিআইডব্লিউটিএ, এনবিআর, বিজিবি, নৌ-পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় সংশ্লিষ্টরা জানান, বন্দর চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছিলেন, এনবিআরের অনুমোদন পাওয়া গেলেই বন্দরটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
রাজশাহীর ব্যবসায়ী মহলের দাবি, বন্দর চালুর প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ১১টি সংস্থার মধ্যে ১০টির অনুমোদন পাওয়া গেছে। এখন শুধু এনবিআরের অনুমোদন প্রয়োজন।
এক অনুমোদনে আটকে বন্দর
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসেন আলী বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরের পাশাপাশি সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটবে।
তিনি বলেন, ‘১১টি সংস্থার মধ্যে ১০টির অনুমোদন মিলেছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এখন শুধু এনবিআরের অনুমোদন পেলেই বন্দরটি চালু হতে পারে। কিন্তু এটি চালু হচ্ছে না।’
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ব্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্যবসায়িক স্বার্থের অভিযোগ
এ দিকে বন্দরটি চালুর প্রক্রিয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি ব্যবসায়ী পক্ষের আপত্তি ও তৎপরতার অভিযোগও সামনে এসেছে। স্থানীয় কিছু আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীর দাবি, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে ভারত থেকে পাথর আমদানিতে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ওপর নির্ভরতা কমবে। ফলে আমদানির ক্ষেত্রে একটি বিকল্প পথ তৈরি হবে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এতে চাঁপাইনবাবগঞ্জকেন্দ্রিক কিছু ব্যবসায়ীর প্রচলিত ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রভাব পড়তে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই বন্দরটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর বিষয়ে কোনো কোনো পক্ষ আপত্তি বা তদবির করছে বলে তারা মনে করছেন।
রাজশাহী চেম্বারের সভাপতি হাসেন আলীও চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি ব্যবসায়ী পক্ষের আপত্তি ও তৎপরতার কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেননি।
তবে কোনো ব্যবসায়ী পক্ষের তৎপরতা বাস্তবে বন্দরটির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই। ফলে এ অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, অনুমোদন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বিশেষ করে এনবিআরের অনুমোদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি জটিলতা আছে কি না কিংবা অতিরিক্ত কোনো শর্ত পূরণ করা বাকি রয়েছে কিনা, এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা
সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে এর সুফল শুধু গোদাগাড়ী বা রাজশাহীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা ও বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা এই নৌপথ ব্যবহার করে ভারতের বাজারের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়াতে পারবেন।
ভারত থেকে পাথর, মার্বেল, কয়লা, খনিজ বালু ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র, পাটজাত পণ্য, মাছ, আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। নদীপথে ভারী পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে পরিবহন ব্যয়ও কমতে পারে। এতে আমদানি-রফতানি ব্যয় কমার পাশাপাশি বাংলাদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের আমদানি-রফতানির বড় অংশ সোনামসজিদ স্থলবন্দরসহ দেশের অন্যান্য বন্দরনির্ভর। ফলে পণ্য পরিবহনে দূরত্ব, সময় ও ব্যয়, তনটিই বাড়ে। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে ব্যবসায়ীদের সামনে একটি বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি হবে।
একই সাথে বন্দরকেন্দ্রিক পরিবহন, শ্রম, গুদাম, লজিস্টিকস ও অন্যান্য সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বাড়তে পারে স্থানীয় বিনিয়োগ এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও।
ব্যবসায়ী মহলের মতে, সুলতানগঞ্জকে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরিপূরক বাণিজ্যপথ হিসেবে গড়ে তোলা হলে পুরো উত্তরাঞ্চলই উপকৃত হতে পারে। একাধিক বাণিজ্যপথ থাকলে ব্যবসায়ীরা সময়, ব্যয় ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী উপযোগী পথ বেছে নিতে পারবেন।
প্রশ্নের উত্তর কোথায়?
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার আগে বন্দরটি চালুর প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি নৌবাণিজ্য রুট পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়ার পর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হয়েছে। অবকাঠামো প্রস্তুত হয়েছে। নাব্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ১১টি সংস্থার মধ্যে ১০টির অনুমোদন পাওয়ার দাবিও রয়েছে।
তাহলে নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হতে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন?
বিশেষ করে এনবিআরের অনুমোদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, কেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, কোনো নতুন শর্ত বা কারিগরি জটিলতা আছে কি না এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন। একই সাথে কোনো পক্ষের আপত্তি বা তদবির থাকলে তা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলছে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বন্দরটির বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। এনবিআরের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আর কোনো পক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে বন্দর চালুর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ সত্য হলে, সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কারণ সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর শুধু একটি বন্দর নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বন্দরনির্ভরতার একটি সম্ভাব্য বিকল্প বাণিজ্যপথ। এর মাধ্যমে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো, পরিবহন ব্যয় কমানো, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
প্রায় ৫৯ বছর পর যে নৌপথ পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেটি এখন আবার প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায়। পদ্মার তীরে বন্দর প্রস্তুত; পরীক্ষামূলক বাণিজ্যও সফল। কিন্তু নিয়মিত বাণিজ্যের নৌযান কবে চলবে, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই।
প্রশ্ন তাই একটাই- সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পরও সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালুর অনুমোদন আটকে আছে কোথায়?



