রফিকুল হায়দার ফরহাদ - যুক্তরাষ্ট্র থেকে
টানা ছয় বিশ্বকাপ খেলা হয়ে গেল লিওনেল মেসির। সেই ২০০৬ সাল থেকে শুরু। এবারে খেললেন ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এখনো আর্জেন্টাইন অধিনায়ক জানাননি তার ভবিষ্যতের কথা। জাতীয় দলে আর খেলবেন কি না। তবে এটা বলে দেয়া যায় শেষ বিশ্বকাপ খেলা হয়ে গেছে এই আর্জেন্টাইন অধিনায়কের। যদিও ২০৩০ এর বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ হবে আর্জেন্টিনায়। সেই পর্যন্ত ৪৩ বছর বয়স হবে তার। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সেই বিশ্বকাপে আর খেলা হবে না তার। হয়তো অচিরেই জানাবেন, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর নয়। অবসরের এখনই সময়। যেকোনো ফুটবলারের সময় শেষ হবে। মেসিও তাই। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, কে হবেন আর্জেন্টিনার পরবর্তী মেসি। কে তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। গোল আর অ্যাসিস্টে দেশকে বছরের পর বছর সার্ভিস দিয়ে যাবেন। আলোচনায় অবশ্য বেশ কয়েকজন। এরা হলেন নিকো পাজ, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো, আলেজান্দ্রো গারনাচো। তবে এরই মধ্যে একজন নতুন মেসি হিসেবে নিজেকে ফুটবল বিশ্বে তুলে ধরেছেন। তিনি হলেন ক্লাউডিও এচিভেরি।
নতুন পেলে বা নতুন ম্যারাডোনা। পেলের যুগের অবসানের পর এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নতুন অসাধারণ প্রতিভাকে নতুন পেলে বা ওই দেশের পেলে বলে ডাকা হতো। ঘানায় তো আবেদি পেলে নামে এক নামকরা ফুটবলার ছিলেন। যার তিন ছেলেই বিশ্বকাপ খেলেছেন। তিন ছেলের সবার ছোট জর্ডান আইয়ু এবারের বিশ্বকাপে ঘানার অধিনায়ক ছিলেন। ব্রাজিলের বেবেতোকে বলা হতো সাদা পেলে।
আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা তার খেলোয়াড়ি জীবনেই পেয়েছেন অনেক ম্যারাডোনা। সৌদি আরবের সাঈদ ওয়াইরানকে বলা হতো মরুর ম্যারাডোনা। রোমানিয়ার জর্জ হ্যাজি পেয়েছিলেন কার্পেথিয়ান ম্যারাডোনা। বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টয়কভকে ডাকা হতো বলকানের ম্যারাডোনা। পরবর্তীতে খোদ আর্জেন্টিনাতেই আরিয়েল ওর্তেগা, সার্জিও অ্যাগুয়েরো, পাবলো আইমার, কার্লোস তেভেজ, কিলি গনজালেস, হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে, মার্সেলো গ্যালার্ডোকে নতুন ম্যারাডোনা বলে ডাকা হতো তাদের পায়ের কাজ আর ফুটবল সেন্সের জন্য।
লিওনেল মেসিকেও প্রথমে আরেক ম্যারাডোনা বলে ডাকা হতো। পরে মেসি নিজ যোগ্যতায় এই ব্র্র্যান্ডকে নিজের করে ফেলেন। অর্থাৎ এরপর সারা বিশ্বে নতুন নতুন স্কিলফুল খেলোয়াড়দের নিজ নিজ দেশের মেসি বলে ডাকা হতো। যেমন এবারের বিশ্বকাপে জর্দানের মুসা আল তামারিকে ডাকা হয় জর্দানিয়ান মেসি নামে। তবে নিজ দেশে এখনো সেভাবে নতুন মেসিকে পাননি লিওনেল মেসি। সেই মান থাকলে তো বিশ্বকাপ দলেই থাকতেন। স্পেনের লামিনে ইয়ামাল ১৯ বছর বয়সে এবারের বিশ্বকাপ খেললেন। দলকেও দ্বিতীয় বিশ্বকাপ পাইয়ে দিতে বিশাল ভূমিকা রাখলেন। আর্জেন্টিনায় আসলে এখনো সেই অর্থে নেই কোনো নতুন মেসি।
আর্জেন্টিনার নতুন মেসিদের মধ্যে শুধু নিকো পাজই এবারের বিশ্বকাপ দলে ছিলেন। খেলেছেন মাত্র একটি ম্যাচ। সেটা আবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির বদলি হিসেবে। ৭৯ মিনিটে মাঠে নামেন তিনি। ইতালির ক্লাব কোমোতে খেলা এই মিডফিল্ডার জাতীয় দলে ১১টি ম্যাচ খেলেছেন। গোল করেছেন একটি। সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপের বাছাইয়ে বলিভিয়ার বিপক্ষে মেসিকে দিয়ে গোল করিয়েছেন। তার স্কিল, শুটিং, ড্রিবলিং দক্ষতায় তাকে আধুনিক নাম্বার ১০ বলা হয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রাথমিক দলে ছিলেন। এই নিকো পাস ১৯৯৮ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ খেলা পাবলো পাজের ছেলে।
ক্লাউডিও এচিভেরিকেও ডাকা হয় নতুন মেসি নামে। তবে এখনো আর্জেন্টিনা সিনিয়র দলে ডাক পাননি। ২০২৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছেন তিনি। ওই আসরে পাঁচ গোল আর তিন অ্যাসিস্টে জিতেছিলেন ব্রোঞ্জ বুট। ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিলেও সেখানে খেলা হয়নি তেমন। বরং লোনে রিভার প্লেট, বায়ার লেভারকুজেন এবং জিরোনাতে খেলেছেন। মেসির মতো ১৭১ সেন্টিমিটার উচ্চতা এচিভেরির। তবে ডান পায়ের শুটিং দক্ষতা এবং অল্প পরিসরের জায়গায় ড্রিবলিং দক্ষতা তাকে মেসির সাথে তুলনায় নিয়ে এসেছে।
আরেক মেসি বলা হয় রিয়াল মাদ্রিদে খেলা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোকে। স্প্যানিশ ক্লাবে ২৩ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন একটি। আর্জেন্টিনার হয়ে এ পর্যন্ত চারটি ম্যাচ খেলেছেন। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে ১৭ বছর ২৯৬ দিনে জাতীয় দলে খেলোয়াড় তিনি। বাম পায়ের এই মিডফিল্ডার শুধু স্কিলেই দক্ষ নন। দুর্দান্ত ফ্রি-কিকও নেন। তাকে এই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে প্রতিভাবান উদীয়মান ফুটবলার বলা হচ্ছে।
আরেক নতুন মেসি ভাবা হচ্ছে আলেজান্দ্রো গারনাচোকে। চেলসির এই ফরোয়ার্ড আগে ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। সেখানে ৯৩ ম্যাচে ১৬ গোল করেছেন। পরবর্তীতে চেলসির হয়ে ২৪ ম্যাচে এক গোল। প্রথমে তিনি স্পেন অনূর্ধ্ব-১৮ দলে খেললেও পরে জন্মসূত্রে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে পাঁচ ম্যাচে চার গোল করেছেন তিনি।
ম্যারাডোনা যুগের অবসানের পর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলতে সময় লেগেছে ২৪ বছর। ১৯৯০ সালের পর ২০১৪। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ দলে মেসি যুগের শুরু ২০০৬ সালে। এরপর ২০১৪ সালে ফাইনাল। অবশেষে ২০২২ সালে চ্যাম্পিয়ন। মেসির আর্জেন্টিনা চার আসরের মধ্যে তিনবার ফাইনাল খেলেছে। কোপা আমেরিকা ট্রফি দেশকে এনে দিয়েছেন ২৮ বছর পর। ১৯৯৩ সালের পর ২০২১-এ। নতুন মেসিরা কতদূর নিতে পারবেন আর্জেন্টিনাকে। কবে আবার সারা বিশ্বে থাকা আর্জেন্টিনার কোটি কোটি ফুটবল ভক্তরা মেতে উঠতে পারবে প্রিয় দলের শিরোপা উৎসবে।



