হুমকিতে দেশের একমাত্র অর্গানিক পেয়ারার জাত ‘কাঞ্চননগর’

Printed Edition
লাল কাপড়ের পুটলিতে বিক্রির জন্য আনা চন্দনাইশের কাঞ্চন নগর জাতের পেয়ারা। ছবিটি গতকাল বাগিচাহাট থেকে তোলা  : নয়া দিগন্ত
লাল কাপড়ের পুটলিতে বিক্রির জন্য আনা চন্দনাইশের কাঞ্চন নগর জাতের পেয়ারা। ছবিটি গতকাল বাগিচাহাট থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত

এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত ইটভাটা স্থাপনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত অর্গানিক পেয়ারার জাত ‘কাঞ্চননগর’। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী পেয়ারার উৎপাদন দিন দিন কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন চাষি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি চন্দনাইশ উপজেলার অন্যতম পাইকারি পেয়ারার বাজার বাগিচাহাট ঘুরে দেখা যায়, এক সময় যেখানে মৌসুমে শতাধিক লাল শালুর পুঁটলিতে ভরা পেয়ারা বিক্রির জন্য সাজানো থাকত, সেখানে এখন মাত্র কয়েকজন বিক্রেতার হাতে আটটি পুঁটলি পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারের সেই আগের চাঞ্চল্য আর নেই।

চট্টগ্রাম নগরের ফল ব্যবসায়ী আবদুল হালিম জানান, তিনি গত ২৫ বছর ধরে বাগিচাহাট থেকে পেয়ারা কিনে নগরে বিক্রি করছেন। আগে বাজারে শত শত পাইকারের ভিড় থাকলেও এখন পেয়ারা যেমন কম, তেমনি ক্রেতার সংখ্যাও কমেছে। তিনি জানান, এবার মাত্র চার পুঁটলি পেয়ারা প্রতি পুঁটলি এক১হাজার ১০০ টাকায় কিনেছেন। খুচরা বাজারে আকারভেদে প্রতি ডজন ৮০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় ব্যবসা আগের মতো নেই।

বাগান মালিকদের দাবি, কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ফলন কমলেও চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়েছে। তাদের মতে, উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে এ অঞ্চলের ছয়টি পাইকারি বাজারে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি ভার (দুই পুঁটলি) পেয়ারা আসত, বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

হাশিমপুর এলাকার বাগান মালিক শাহাব উদ্দিন বলেন, ইটভাটার ধোঁয়া ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ফলন ক্রমেই কমছে। দ্রুত কার্যকরব্যবস্থা নেয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী কাঞ্চননগর পেয়ারা একসময় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। পাইকারি ব্যবসায়ী মো: আলী জানান, প্রতি বছর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, ফেনী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় তিনি এই পেয়ারা সরবরাহ করতেন। কিন্তু এবার উৎপাদন কম থাকায় সরবরাহও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় অর্ধশত বছর আগে চন্দনাইশের কাঞ্চননগর পাহাড়ি এলাকায় এই পেয়ারার চাষ শুরু হয়। পরে তা বাণিজ্যিকভাবে বিস্তার লাভ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর জুলাই থেকে টানা চার মাস এই পেয়ারার মৌসুম চলে এবং উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনের সাথে ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। ফলে ফলন কমে যাওয়ায় তাদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

কৃষকদের দাবি, এ অঞ্চলের উর্বর পাহাড়ি মাটিতে এই পেয়ারা চাষে সাধারণত রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। গাছ থেকে ডাঁটাসহ সংগ্রহ করায় কোনো ধরনের ফরমালিন ছাড়াই চার থেকে পাঁচ দিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। এ কারণেই কাঞ্চননগর পেয়ারা স্বাস্থ্যসম্মত অর্গানিক ফল হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে এবং চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে এর চাহিদা অত্যন্ত বেশি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, পটিয়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও বোয়ালখালী উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার একর পাহাড়ি এলাকায় পেয়ারার বাগান রয়েছে। এর মধ্যে চন্দনাইশই কাঞ্চননগর জাতের উৎপত্তিস্থল। গত বছর হেক্টরপ্রতি ১৫-১৬ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বর্তমানে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আপ্রু মার্মা বলেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং গাছের গোড়ায় প্রয়োজনীয় জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ফলন বিপর্যয় অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন।

তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু কৃষি পরামর্শ নয়, পাহাড় রক্ষা, ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের একমাত্র অর্গানিক পেয়ারার জাত ‘কাঞ্চননগর’ একসময় ইতিহাসে পরিণত হতে পারে।