সরকারি বেতন বাড়ছে, বড় চাপ পড়বে অর্থনীতিতে

বছরে অতিরিক্ত ব্যয় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা; রাজস্ব ঘাটতির চেয়েও বেশি ব্যাংকঋণ বাড়লে চাপে পড়তে পারে বেসরকারি বিনিয়োগ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এক লাফে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব শুধু প্রায় ৩৩ লাখ মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি এখন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত। নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। অথচ সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে প্রায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে যে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে, তা গত অর্থবছরের পুরো রাজস্ব ঘাটতির চেয়েও প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

এখানেই সৃষ্টি হয়েছে মূল প্রশ্ন- সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর এই বিপুল অর্থ আসবে কোথা থেকে?

রাজস্ব আদায় দ্রুত বাড়াতে না পারলে সরকারের সামনে প্রধানত ব্যয় সঙ্কোচন, নতুন রাজস্ব আহরণ অথবা ঋণ নেয়ার পথ খোলা থাকবে। কিন্তু ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে এক দিকে সরকারের সুদব্যয় বাড়বে, অন্য দিকে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। আর বাড়তি অর্থ যদি সরাসরি অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয় কিন্তু তার সাথে পণ্য ও সেবার উৎপাদন না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাম্প্রতিক অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারের বাড়তি ব্যয়ের চাপ একসাথে বাজারে না গিয়ে ধাপে ধাপে অর্থনীতিতে প্রবেশ করবে। একই সময়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর জন্য সরকার কিছুটা সময়ও পাবে। তবে পুরো কাঠামো বাস্তবায়িত হলে শেষ পর্যন্ত বছরে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত হারে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের জন্য অপেক্ষাকৃত সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক বেতন বৃদ্ধি বেশি অর্থসঙ্গত হতে পারে। বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি বিনিয়োগেও। কারণ, সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়লে ব্যাংকগুলোর ঋণযোগ্য অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে কিংবা ঋণের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ নতুন পে-স্কেলের সুপারিশকে মূল্যস্ফীতি এবং গত কয়েক বছরের নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন। তবে বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মজুরি ব্যবধানে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়ানোর উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা না গেলে অর্থনীতিতে নতুন ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে।

ড. আবদুল মজিদ বলেন, বাড়তি ব্যয় মেটাতে যদি সরকারকে অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ নিতে হয়, একই সময়ে রাজস্ব আদায় না বাড়ে এবং পণ্য ও সেবার সরবরাহও না বাড়ে, তাহলে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির চাপে হারিয়ে যেতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, নি¤œ আয়ের শ্রমিক এবং বেসরকারি খাতের কর্মীরা।

৩৩ লাখ মানুষের আয় বাড়বে

নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। বিদ্যমান কাঠামোয় যেখানে সর্বনি¤œ মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা, সেখানে নতুন কাঠামোয় তা ২০ হাজার টাকা করা করা হয়েছে। সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। এটি কার্যকর হওয়ার ফলে শুধু নি¤œ গ্রেডের কর্মচারীদের আয় বাড়বে না। নবম গ্রেড থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও বড় ধরনের বেতন সমন্বয় হবে। এর সাথে পেনশনভোগীদের সুবিধা যুক্ত হলে সরকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের দায় আরো বাড়বে।

অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যয়ের একটি ইতিবাচক দিকও আছে। সরকারি কর্মচারীদের হাতে বাড়তি অর্থ গেলে তা খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, পোশাক, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় ব্যয় হতে পারে। এতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, চাহিদা বাড়ার বিপরীতে সরবরাহ কতটা বাড়বে। সরবরাহ বাড়ার আগেই মানুষের হাতে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ চলে এলে বাজারে চাহিদাজনিত মূল্যচাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহন ও সেবার মতো খাতে এর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হতে পারে।

রাজস্বের দুর্বল ভিত্তিই বড় ঝুঁকি

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস- তিন প্রধান উৎসেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

অর্থাৎ সরকারের বর্তমান রাজস্ব সক্ষমতা যেখানে বিদ্যমান ব্যয় মেটাতেই চাপে রয়েছে, সেখানে প্রতি বছর আরো এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় যুক্ত হওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।

এটি এককালীন কোনো অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় নয়। বেতন-ভাতা ও পেনশন হলো পুনরাবৃত্ত বা স্থায়ী ব্যয়। একবার বেতন বাড়লে পরবর্তী বছরগুলোতেও তা বহন করতে হবে। বরং বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পেনশন এবং অন্যান্য সুবিধা যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে এ ব্যয় আরো বাড়তে পারে।

এ কারণে নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে- সরকার কি একই সময়ে এমন রাজস্ব সংস্কার করতে পারবে, যার মাধ্যমে এই স্থায়ী ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিজস্ব আয় থেকে মেটানো সম্ভব হবে?

ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে?

এই প্রশ্ন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সরকারের ইতোমধ্যে বেড়ে যাওয়া ব্যাংকঋণের কারণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নিট ৯৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। পরে জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি ব্যাংকঋণ এক লাখ ২৬ হাজার ১০২ কোটি টাকায় পৌঁছায়- যেখানে পুরো অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে যদি আবার ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরো বাড়তে পারে। এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে বেসরকারি বিনিয়োগে।

সরকার যখন ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তখন একই ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমিত ঋণযোগ্য অর্থের একটি অংশ সরকারি খাতে চলে যায়। ফলে শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে অথবা সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।

এমনিতেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বরের জন্য বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়েছে। মে মাসে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র পাঁচ শতাংশ। অর্থাৎ যে সময়ে অর্থনীতির গতি বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন, সেই সময়ে সরকারি ব্যয়ের অর্থায়নে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিপরীত ফল দিতে পারে।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, স্বস্তি এখনো নেই

নতুন পে-স্কেলের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হচ্ছে মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া। কিন্তু একই সাথে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় মূল্যস্ফীতির বর্তমান অবস্থাটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জুলাই ২০২৬-এ দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুনে এটি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যমূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।

অন্য দিকে জুলাইয়ে জাতীয় মজুরি হার সূচক বেড়েছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধির হার এখনো মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য কম।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। সাধারণ শ্রমজীবী ও বেসরকারি খাতের বড় অংশ যখন মূল্যস্ফীতির সাথে তাল মিলিয়ে আয় বাড়াতে পারছে না, তখন সরকারি কর্মচারীদের বেতন যদি ১০০ শতাংশের বেশি পর্যন্ত বাড়ে, তাহলে শ্রমবাজারে একটি নতুন মজুরি ভারসাম্য সৃষ্টি হবে।

বেসরকারি খাতে সৃষ্টি হবে নতুন চাপ

সরকারি চাকরির বেতন-ভাতা দেশের শ্রমবাজারে দীর্ঘদিন ধরে একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করে। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার ফলে ব্যাংক, বীমা, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও বিভিন্ন সেবা খাতে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বেতন বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হয়তো সেই চাপ সামলাতে পারবে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি ব্যবসা, উৎপাদনমুখী শিল্প কিংবা আর্থিক চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তা কঠিন হবে।

ফলে দু’টি পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এক. দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেতন বাড়াবে। এতে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে স্থানান্তরিত হতে পারে। দুই. প্রতিষ্ঠানগুলো বেতন না বাড়িয়ে কর্মী কমানো, নিয়োগ স্থগিত করা অথবা দক্ষ কর্মীদের হারানোর পথ বেছে নিতে পারে। দু’টির কোনোটিই অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।

সরকারি-বেসরকারি বৈষম্যের নতুন মাত্রা

নতুন পে-স্কেলের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে মজুরিবৈষম্য। সরকারি কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা, পেনশন, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধার সাথে বড় বেতন বৃদ্ধি যুক্ত হলে সরকারি চাকরি আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এর ফলে দক্ষ তরুণদের বড় অংশ উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতের পরিবর্তে সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকতে পারে।

অর্থনীতির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেসরকারি খাতই মূলত বিনিয়োগ, উৎপাদন, রফতানি ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। সরকারি চাকরির বেতন বাড়ানো তাই শুধু কর্মচারীদের জীবনমানের প্রশ্ন নয়; এটি শ্রমবাজারে দক্ষ জনবলের বণ্টনকেও প্রভাবিত করতে পারে।

অর্থনীতিতে কিভাবে ঢুকবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা?

নতুন পে-স্কেলের প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাই ব্যয়ের পরিমাণ নয়, অর্থের উৎস।

যদি বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ রাজস্ব থেকে আসে, তাহলে অর্থনীতিতে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ সরকার জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বেতন হিসেবে পুনর্বণ্টন করবে। কিন্তু রাজস্ব না বাড়িয়ে যদি ঋণ নিয়ে ব্যয় করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। সরকারের ঋণ বাড়বে, সুদ ব্যয় বাড়বে এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

আর যদি একই সাথে অর্থ সরবরাহ বাড়ে এবং পণ্য ও সেবার উৎপাদন না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ একই এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা তিনভাবে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে- রাজস্বনির্ভর হলে পুনর্বণ্টন, ঋণনির্ভর হলে ক্রাউডিং-আউট এবং অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহনির্ভর হলে মূল্যস্ফীতির চাপ।

সামনে সরকারের বড় পরীক্ষা

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের সামাজিক যুক্তি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন বেতন কাঠামো পরিবর্তন হয়নি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেতন সমন্বয় না করলে দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং সরকারি প্রশাসনের কর্মক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন সৃষ্টি হতে পারে।

কিন্তু একই সাথে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতাও উপেক্ষা করা যায় না। বর্তমান বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা এবং সরকারি ব্যাংকঋণ ইতোমধ্যে বাজেট লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে।

এই অবস্থায় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সাফল্য নির্ভর করবে কত শতাংশ বেতন বাড়ানো হলো তার চেয়ে বেশি কিভাবে অর্থায়ন করা হলো তার ওপর।

সরকার যদি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে পারে, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারে এবং ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করে, তাহলে বাড়তি আয় অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু রাজস্ব ঘাটতি অপরিবর্তিত রেখে যদি বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ নিয়ে এই স্থায়ী ব্যয় মেটানো হয় তাহলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও তার মূল্য দিতে হতে পারে পুরো অর্থনীতিকে- উচ্চ ঋণ, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আবারো বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে।

সুতরাং নবম পে-স্কেলের আসল পরীক্ষা বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তে নয়; এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার এই বাড়তি দায় রাষ্ট্র কতটা টেকসইভাবে বহন করতে পারে, সেই সক্ষমতায়।