ফরাসি ফুটবলের সোনালি প্রজন্ম

Printed Edition

১৯৮৬ সালে সেমিতে হারা দল। সেই দলটিই পরপর দুই বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি। তা ১৯৯০ ও ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ আসরে। এরপর নিজ মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজনের পূর্ণ সুবিধা নিয়েছে তারা। ১৯৯৮ সালে নিজ মাঠে প্রথম বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন। সেই দলই পরের বিশ্বকাপে অর্থাৎ ২০০২ সালের জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে গেছে। ২০০৬ সালে রানার্সআপ। এরপর ২০১০-এর গ্রুপ পর্ব ডিঙাতে ব্যর্থ হওয়া। এর আগে ১৯৬২, ১৯৭০ ও ১৯৭৪-এর বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। সেই দলটিই এখন টানা তিন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালের রানার্সআপ। এবার সেমিতে উঠে ফাইনালে খেলার ছক কষছে। হঠাৎ কিভাবে একটি দল এত ভালো হয়ে গেল বিশ্বকাপে। আসলে এটি সম্ভব হয়েছে ইউরোপিয়ান এই দেশটির সোনালি প্রজন্মের ফুটবলারদের কারণে। জিনেদিন জিদান, থিয়েরি অঁরি দিয়ে শুরু। আর তা এখন টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল ওলিসে এবং উসমান দেম্বেলেরা।

ফরাসি ফুটবলে অনেক বড় তারকা ছিলেন মিশেল প্লাতিনি। তিনি পারেননি ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ এনে দিতে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে নান্দনিক ম্যাচ শেষে ব্রাজিলকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সেমিতে যায়; কিন্তু এরপর সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হারের পর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও জিততে পারেনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে। ফলে চতুর্থ হয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ফিরে আসতে হয় দেশে। আসলে জিকো-কারেকাদের ব্রাজিলকে হারানো টিগানা-জর্জ ফার্নান্দেজরা পরের দুই ম্যাচে আর নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

প্লাতিনি যুগের অবসান হওয়ার পর পরের প্রজন্মের এরিখ কাতোয়ারা দলকে বিশ্বকাপেই নিতে পারেনি। এরপর নিজ মাঠে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকাপ জয়। তা জিনেদিন জিদান, অলিভার বিয়েরহাফ, ক্রিস্টোফার ডুগেরি, লরেন্ত ব্ল্যাংক, থিয়েরি অঁরি ও ডেভিড ত্রেজেগের কাঁধে ভর দিয়ে।

এরপর সেই দলই খেই হারিয়ে ফেলে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে সেনেগালের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে। এরপর গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়। পরের বিশ্বকাপে (২০০৬ জার্মানি) জিদানকে ফিরিয়ে এনে ফাইনালে ওঠা; কিন্তু ইতালির বিপক্ষে ফাইনালে জিদানের হেড বাট-এ (মাথা দিয়ে গুঁতা দেয়া) সর্বনাশ। ফাইনালে হেরে দ্বিতীয় শিরোপা জিততে ব্যর্থ হওয়া। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন ইতালির সাথে তারাও গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ।

সেই ফরাসি ফুটবলই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ দিয়ে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করানো অধিনায়ক দিদিয়ের দেশম জাতীয় দলের হেড কোচ হওয়ার পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে ফরাসিদের চেহারা। বিশ্বকাপ মঞ্চে একের পর এক সাফল্য। আর তা সম্ভব হয়েছে জিদানদের পরবর্তী সোনালি প্রজন্ম অলিভার জিরুড, অ্যান্তনি গ্রিজম্যান, পল পগবা, কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলেদের কল্যাণে।

দেম্বেলে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে নিয়মিত ছিলেন না। এরপরও গ্রিজম্যান-জিরুড এবং প্রথমে বদলি ও পরে নিয়মিত খেলা এমবাপ্পেরা একে একে সব শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে উড়িয়ে বিশ্বকাপ জয় করেন। জিরুড, গ্রিজম্যানরা কাতার বিশ্বকাপেও ছিলেন। তাদের সাথে এমবাপ্পের উজ্জ্বল উপস্থিতি দলকে ফাইনালে নিয়ে যায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে স্মরণীয় ফাইনালে ৩-৩-এ ১২০ মিনিট শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে হারতে হয় আর্জেন্টিনার কাছে।

গ্রিজম্যান, জিরুডদের পর্ব এখন শেষ। এখন নেতৃত্বে এমবাপ্পে। সাথে উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, দেজিরে দুয়ে, ব্রাডলি বার্কোলারা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্সকে। আর তাদের পেছনে সেই কোচ দেশম। ফরাসিরা এই যে একের পর এক নতুন নতুন প্রতিভা পাচ্ছে, সেটির জোগান দিচ্ছে রাজধানী প্যারিসের ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ক্লেইরেফন্টেইন একাডেমি। এমবাপ্পেরা সেই একাডেমিরই সৃষ্টি।