ফোবানার নির্বাহী কমিটির চেয়ারপারসন রবিউল করিম বেলাল এর। বিশেষ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি আবু সাবেত।
প্রশ্ন : আপনি ২০১০ সালে ‘ভিশন ২০২০’ ঘোষণা করেছিলেন। সেটির মূল লক্ষ্য কী ছিল?
রবিউল করিম বেলাল : এটা ফোবানার জন্য ২০৪০ পর্যন্ত রোডম্যাপ। এর আগে ২০০৯-২০১০ সালে আমি প্রথমবারের জন্য চেয়ারপারসন হয়েছিলাম তখন দিয়েছিলাম ভিশন ২০২০। ভিশন ২০২০ ছিল মূলত ফোবানাকে একটি আরো শক্তিশালী, আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সংগঠনে রূপান্তরের একটি রূপরেখা। সেখানে সাংগঠনিক সংস্কার, স্থায়ী কাঠামো, তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশীদের বৃহত্তর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ছিল। সময়ের চেয়ে আমরা হয়তো একটু এগিয়েই চিন্তা করেছিলাম।
প্রশ্ন : কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি কেন?
রবিউল করিম বেলাল : সত্যি বলতে, সমন্বয়ের অভাবই ছিল সবচেয়ে বড় কারণ। একটি বৃহৎ সংগঠনে পরিকল্পনা যত ভালোই হোক, সবাই একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে না পারলে সফল হওয়া কঠিন। আমি এটিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখি না; বরং এটি ছিল আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। সেই অভিজ্ঞতাই আজ আমাকে আরো বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করতে সাহায্য করছে। সে জন্য আমি শ্রেষ্ঠত্বের পথে অগ্রযাত্রার মাধ্যমে ভিশন ২০৪০ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে আগ্রহী।
প্রশ্ন : এখন আপনি ফোবানার নির্বাহী কমিটির চেয়ারপারসন। নতুন করে ‘ভিশন ২০৪০’ কেন?
রবিউল করিম বেলাল : কারণ আমি বিশ্বাস করি, একটি সংগঠনেরও দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন থাকা উচিত। ভিশন ২০৪০ কোনো ব্যক্তির পরিকল্পনা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি রোডম্যাপ। আমরা চাই, ২০৪০ সালের মধ্যে ফোবানা উত্তর আমেরিকার প্রতিটি বাংলাদেশীর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, প্রতিনিধিত্বশীল এবং ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হোক। কিছুদিন আগে ভিশন ২০৪০ নিয়ে ৮ মিনিটের একটি ভিডিও সবাইকে দেখানোর চেষ্টা করেছি। মেপে দেখার ক্ষমতা যদি না থাকে, তাহলে বুঝতে পারা যাবে না বর্তমান অবস্থানটা কোথায়, যদি বুঝতে না পারা যায়, তাহলে পরিবর্তন কী করবে, পরিবর্তন না করতে পারলে উন্নতি ও সম্ভব না, বা লক্ষ্যেথপৌঁছানো সম্ভব না।
প্রয়োজন মতো পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের প্রয়োজন আছে, তার জন্য প্রতিটা মাইলফলকের মেপে দেখার যন্ত্র দরকার বা সময়োপযোগী টুল্স বা সিস্টেমে রাখতে হবে। আগামী তিন বছরের ২০২৭-২০৩০ মধ্যে কী কী করা উচিত বা সম্ভব?
পরের পাঁচ বছর ২০৩০-২০৩৫ কী করার দরকার এবং আগামী আরো পাঁচ বছর ২০৩৫-২০৪০ আরো কী কী করতে হবে, সেটির একটা রোডম্যাপ তৈরি থাকবে, যা ভিশন ২০৪০-এ বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফোবানা একটা ননপ্রোফিট অর্গানাইজেশন থেকে ইনস্টিটিউশনে রূপান্তর করা ফোবানার সবগুলো খুঁটি শক্তিশালী গড়ে তুলতে সাহায্য করে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া।
প্রশ্ন : ভিশন ২০৪০-এর প্রধান অগ্রাধিকার কী?
রবিউল করিম বেলাল : প্রথমত সাংগঠনিক ঐক্য। দ্বিতীয়ত, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করা। তৃতীয়ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তোলা। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা এবং কমিউনিটি সেবাকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। আমরা এমন একটি ফোবানা চাই, যেখানে সবাই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব দেখতে পাবেন।
প্রশ্ন : ভিশন ২০৪০ বাস্তবায়নে আপনি কিভাবে এগোচ্ছেন?
রবিউল করিম বেলাল : আমি ইতোমধ্যে ফোবানার বর্তমান ও সাবেক নেতৃবৃন্দ, স্ট্যান্ডিং কমিটি, বিভিন্ন সদস্য সংগঠন এবং কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেছি। আমি বিশ্বাস করি, আলোচনার মাধ্যমেই সেরা সিদ্ধান্ত আসে। তাই এটি কোনো একক উদ্যোগ নয়; এটি হবে সবার অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি সম্মিলিত পরিকল্পনা। তবে এ ব্যাপারে আমি তিনটি নতুন প্রস্তাবনার কথা উল্লেখ করতে চাই, যেমন অতীত থেকে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন। বর্তমানকে সাফল্য ও অর্জনের মধ্য দিয়ে উদযাপন। উদ্ভাবন, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়া।
প্রশ্ন : ফোবানার ৪০ বছরে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
রবিউল করিম বেলাল : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঐক্য ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা। পৃথিবী বদলেছে, মানুষের চিন্তাভাবনাও বদলেছে। তাই ফোবানাকেও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। সংগঠন তখনই টিকে থাকবে, যখন নতুন প্রজন্ম এটিকে নিজেদের সংগঠন বলে মনে করবে।
প্রশ্ন : ৪০তম ফোবানা সম্মেলনকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
রবিউল করিম বেলাল : এটি কেবল একটি সম্মেলন নয়; এটি ফোবানার চার দশকের অর্জনের উদযাপন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া (বাক)-এর নেতৃবৃন্দ, আয়োজক কমিটি এবং শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক গত এক বছর ধরে যে পরিশ্রম করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি বিশ্বাস করি, লস অ্যাঞ্জেলেসের এই সম্মেলন ফোবানার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
প্রশ্ন : ভিশন ২০৪০ বাস্তবায়নে প্রবাসীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
রবিউল করিম বেলাল : অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংগঠন শুধু নির্বাহী কমিটি দিয়ে চলে না। এটি চলে সদস্য সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক, তরুণ প্রজন্ম, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী এবং সাধারণ কমিউনিটির সম্মিলিত অংশগ্রহণে। তাই আমি চাই, সবাই এই স্বপ্নের অংশীদার হোন।
প্রশ্ন : ব্যক্তিগতভাবে আপনার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?
রবিউল করিম বেলাল : আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো- একদিন যেন বলা যায়, ফোবানা উত্তর আমেরিকার প্রতিটি বাংলাদেশীর ঘরের সংগঠন। এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে; কিন্তু বিভাজন থাকবে না; নেতৃত্ব বদলাবে, কিন্তু লক্ষ্য বদলাবে না। সত্যি বলতে, ভিশন ২০৪০ বাস্তবায়নই এখন আমার দিবারাত্রির স্বপ্ন।
প্রশ্ন : উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
রবিউল করিম বেলাল : আমরা সবাই ভিন্ন শহরে থাকি, ভিন্ন পেশায় কাজ করি, ভিন্ন মত পোষণ করি; কিন্তু আমাদের পরিচয় এক আমরা বাংলাদেশী। আসুন, বিভেদের দেয়াল ভেঙে ঐক্যের সেতু গড়ি। ফোবানাকে আরো শক্তিশালী, আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আগামী প্রজন্মের উপযোগী একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সবাই একসাথে কাজ করি। আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি এক থাকি, তাহলে ভিশন ২০৪০ শুধু একটি স্বপ্ন থাকবে না- এটি বাস্তবে রূপ নেবে।
প্রশ্ন : একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চাই, সেটি হলো আপনার দেশের বাড়ি কোথায়? ছেলে-মেয়ে ক’জন?
রবিউল করিম বেলাল : দেশের বাড়ি বগুড়া শহরে। আমার এক ছেলে এবং দুই নাতনী রয়েছে। বর্তমানে স্ত্রী শিরিন আক্তারকে নিয়ে পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় থাকি এবং ছেলে মোবাশ্বির করিম আকাশ ও বৌমা নাদিয়া করিম দুই মেয়ে নিয়ে নিউ জার্সিতে বসবাস করছেন।
প্রশ্ন : লস অ্যাঞ্জেলেসে ফোবানার চার দশকের অর্জনের উদযাপন নিয়ে শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
রবিউল করিম বেলাল : আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।



