ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে মামলা : সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ, যুক্তিতর্ক ৪ আগস্ট

লাশ আনতে পারিনি আওয়ামী লীগ যুবলীগের সশস্ত্র অবস্থানের কারণে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মিরপুরে গুলিতে নিহত কলেজছাত্র ফয়জুল ইসলাম (রাজন)-এর লাশ হাসপাতাল থেকে আনতে পারেনি পরিবার। কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দীতে নিহতের বড় ভাই মো: রাজিব বলেছেন, হাসপাতালের সামনে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা অবস্থান করছিলেন।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৮তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন রাজিব। তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল আগামী ৪ আগস্ট যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

জবানবন্দীতে রাজিব বলেন, তাদের দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে ফয়জুল ইসলাম ছিলেন ছোট। তিনি ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলেন এবং পাশাপাশি একটি কসমেটিকসের দোকানে কাজ করতেন। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই থেকে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে শুরু করেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রাজিব বলেন, ১৯ জুলাই তিনি কর্মস্থল থেকে কেরানীগঞ্জের বাড়িতে ফেরার পর মা জানান, দুপুর ১২টার পর থেকে ফয়জুলের সাথে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। সন্ধ্যা ৬টার দিকে এক অপরিচিত নারী ফোন করে জানান, ফয়জুল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পরে তিনি মিরপুরে অবস্থানরত তার বোনকে আজমল হাসপাতালে খোঁজ নিতে পাঠান। রাত ৮টার দিকে বোন নিশ্চিত করেন, ফয়জুল নিহত হয়েছেন।

এরপর জবানবন্দীতে তিনি বলেন, হাসপাতালের সামনে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র লোকজন অবস্থান করায় পরিবারের পক্ষে লাশ নেয়া সম্ভব হয়নি। পরে দিবাগত রাত প্রায় দেড়টার দিকে এক অপরিচিত ব্যক্তি অ্যাম্বুলেন্সে করে ফয়জুলের লাশ তাদের কেরানীগঞ্জের বাড়িতে পৌঁছে দেন।

রাজিব আদালতকে আরো জানান, লাশে তিনি বুকের ডান পাশে গুলির একটি ছিদ্র দেখতে পান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুলিটি বুকের সামনের দিক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। পরদিন তাকে স্থানীয় বাহেরচর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।

জবানবন্দীতে তিনি আরো বলেন, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া তথ্য থেকে তিনি জানতে পারেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নির্দেশে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা তার ভাইকে হত্যা করেছেন। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

তবে এ বক্তব্য সাক্ষীর জবানবন্দীর অংশ; অভিযোগগুলো বিচারাধীন এবং এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

রাজিবের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য উপস্থাপন শেষ হয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল আগামী ৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক (ফাইনাল আর্গুমেন্ট) উপস্থাপনের জন্য দিন নির্ধারণ করেন।

এ দিন প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। তার সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিমসহ অন্যরা। রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান তদন্ত কর্মকর্তা আহমেদ নাসের উদ্দিন মোহাম্মদকে জেরা করেন।

মামলার প্রধান আসামি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। অন্য আসামিরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী, সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়া হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং নেতাকর্মীদের মাঠে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলো বর্তমানে বিচারাধীন।