ব্রিকসের ‘দ্য ইউনিট’ ও ডি-ডলারাইজেশন মুদ্রা ব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ায় ব্রিকসের নতুন নোট ‘দ্য ইউনিট’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এই প্রতীকী মুদ্রায় ব্রিকসের পাঁচ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য-রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার পতাকা বৃত্তাকারে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরাসরি একটি একক বৈশ্বিক মুদ্রা না হলেও ডলার-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ। গত প্রায় আট দশক ধরে মার্কিন ডলার বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে আধিপত্য বজায় রেখেছে; সেই কাঠামোর বিপরীতে নতুন সমান্তরাল ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে ব্রিকস উদ্যোগ।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দ করে। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ও চীন ডলার ও ইউরোর ওপর নির্ভরতা কমাতে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ নীতিকে জোরদার করে। একই সাথে পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনব্যবস্থা সুইফটের বিকল্প প্রযুক্তিগত অবকাঠামোও তারা গড়ে তুলেছে বলে দাবি করা হয়।

এই প্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো যদি ডলার বিকল্প মুদ্রা চালুর পথে অগ্রসর হয়, তবে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেন- যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং খনিজ সম্পদের বড় অংশ ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর অধীনে রয়েছে- এ বিষয়টি এই জোটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তবে সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ একরকম নয়। বিশেষ করে ভারত ডি-ডলারাইজেশন ইস্যুতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

ভারতের কৌশলকে বিশ্লেষকরা ‘দড়ির ওপর হাঁটা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একদিকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে ভূমিকা বাড়ানোর আকাক্সক্ষা, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা-এই দুই বাস্তবতার ভারসাম্য রক্ষা করছে নয়াদিল্লি। চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় ব্রিকস মঞ্চ ব্যবহার করলেও ডলারের সাথে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না ভারত।

এই প্রেক্ষাপটে ভারত নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা ই-রুপি-কে শক্তিশালী করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ই-রুপিকে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে বাণিজ্য উপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ই-রুপি ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানানো হয়। ভারত সরকার ব্রিকস প্ল্যাটফর্মে এই ডিজিটাল অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করতে চায়।

চলতি বছরে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে- যেখানে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (ঈইউঈ) একে অপরের সাথে আন্তঃসংযুক্ত থাকবে। ভারতের মতে, একটি একক ‘দ্য ইউনিট’ মুদ্রার চেয়ে নিজ নিজ দেশের ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে সরাসরি লেনদেন অধিক বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ হতে পারে। এতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে, পাশাপাশি আর্থিক সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে।

তবে ভারতের অর্থনীতির বড় অংশ-বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রফতানিনির্ভর। ফলে ডলারের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়া তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই ভারত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়াচ্ছে। এই কৌশল ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ধীরে কমানোর চেষ্টা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে চলার একটি মধ্যপন্থা।

বিশ্লেষকদের মতে, ডলার ব্যবস্থার অবসান তাৎক্ষণিকভাবে ঘটবে না। তবে ব্রিকস যদি সফলভাবে সমান্তরাল মুদ্রা কাঠামো ও লেনদেন অবকাঠামো (যেমন ব্রিকস পে সিস্টেম) গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আগামী দশকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হতে পারে। সম্ভাব্য চিত্রে ডলার, ইউরো এবং ব্রিকস-ভিত্তিক ব্যবস্থার সহাবস্থান থাকবে- যা বিশ্ব অর্থনীতিকে একক আধিপত্যের বদলে বহুমুখী কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

তবে এ লক্ষ্যে ব্রিকসের ভেতরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন-ভারত সম্পর্ক, ইরান-ইউএই সহযোগিতা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন সদস্য দেশের স্বার্থের পার্থক্য- এসব চ্যালেঞ্জ সমাধান না হলে পূর্ণাঙ্গ বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে ‘দ্য ইউনিট’ কেবল একটি প্রতীকী মুদ্রা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত। ডলারের আধিপত্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, রাজনৈতিক ঐক্য এবং অর্থনৈতিক আস্থার সমন্বয় অপরিহার্য- যা এখনো গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।