মিনারুল হক বান্দরবান
দেশী আমের পাশাপাশি এখন বিদেশী জাতের আমের আবাদে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে বান্দরবানে। পাহাড়ি এ জেলায় উৎপাদিত নানা রঙ ও আকৃতির বিদেশী আম স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। এমনকি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে এসব আম। কৃষি বিভাগ ও উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশী জাতের আমের বাণিজ্যিক চাষ পাহাড়ি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
সরজমিনে দেখা যায়, বান্দরবানের বাজারগুলো এখন দেশী-বিদেশী নানা জাতের আমে ভরপুর। দেশী জাতের আম্রপালি (স্থানীয়ভাবে রুপালি নামে পরিচিত) ও রাংগোয়াইয়ের পাশাপাশি বাজারে মিলছে জাপানের বিখ্যাত মিয়াজাকি, কাটিমন, কিউজাই, ব্রুনাই কিং, ব্যানানা, রেড পালমার, রেড কুইন ও জাম্বুরা আমসহ ১৩টিরও বেশি বিদেশী জাতের আম।
জেলা সদরের বাজারে আকারভেদে আম্রপালি ও রাংগোয়াই আম ৬০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্য দিকে বিদেশী জাতের রেড পালমার ও রেড কুইনের দাম ৩০০ টাকা, ব্যানানা আম ২০০ টাকা এবং কিউজাই আম ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কিছু বিদেশী জাতের একেকটি আমের ওজন চার থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত হয়, যা ক্রেতাদের মধ্যে কৌতুহল ও বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে বান্দরবানে আমের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। এক সময় যেখানে মূলত দেশী আমের চাষ হতো, সেখানে এখন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে বিদেশী জাতের আমের চাষ হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১০ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৮০৮ মেট্রিক টন আম। আগের বছর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৭ মেট্রিক টন।
আম উৎপাদনের পাশাপাশি রফতানিতেও এগোচ্ছে বান্দরবান। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলা থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কেজি আম বিদেশে রফতানি করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে লামা উপজেলার মেরেডিয়ান আম বাগান থেকে প্রায় তিন মেট্রিক টন আম বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
জেলা সদরের পাইকারি ফল ব্যবসায়ী মো: ইয়িলাস বলেন, বাজারে দেশী-বিদেশী নানা জাতের আম পাওয়া যাচ্ছে এবং দামও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে। এই বছর আম, কাঁঠাল, আনারস, লিচু, ড্রাগন ফলের ভালো ফলন হয়েছে বান্দরবানে। হাটবাজারগুলোতে এখন তাল, লিচু, আনারস, কাঁঠালের পাশাপাশি প্রচুর দেশী-বিদেশী আম পাওয়া যাচ্ছে আর দামও ক্রেতার হাতের নাগালে।
তিনি বলেন, বান্দরবানের উৎপাদিত ফল ফরমালিনমুক্ত হওয়ায় চট্টগ্রাম, ঢাকা, কেরানীহাট, আমিরাবাদসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাহিদা বাড়ছে। একসময় শুধু দেশী আম পাওয়া গেলেও এখন বিদেশী জাতের আমও ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।
জেলা সদরের আম ব্যবসায়ী মো: আফনানুর রহমান বলেন, রুমা উপজেলা ও চিম্বুক এলাকার পাহাড়ি বাগান থেকে বিদেশী আম সংগ্রহ করে জেলা সদরের বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। বান্দরবানের আম সুস্বাদু ও নিরাপদ হওয়ায় স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও বেশ জনপ্রিয়।
লামা উপজেলার মেরেডিয়ান আম বাগানের কৃষিবিদ আবু সাঈদ মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, চীনের সাথে চুক্তির আওতায় বান্দরবানে উৎপাদিত দেশী ও বিদেশী জাতের আম বিদেশে রফতানি হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ খাতে আরো বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আবু নাঈম মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, আমচাষে কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আমের রফতানি বাড়াতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর পাহাড়ি মাটি এবং নতুন জাতের সফল চাষাবাদের কারণে বান্দরবান ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আম উৎপাদন ও রফতানি অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।



