শুভ্রতার লাবণ্যে শরতের আলো

Printed Edition
শুভ্রতার লাবণ্যে শরতের আলো
শুভ্রতার লাবণ্যে শরতের আলো

হাসান মাহমুদ রিপন

সৌন্দর্যে ঐশ্বর্যে রূপে লাবণ্যে শরৎরাণীর রূপের অহংকারে কাশফুল। মাঠ-ঘাট, নদী-নালা ও বিলের পাড়ে হেসে উঠেছে এ কাশফুল। ভাদ্র ও আশ্বিন মাস মিলে ‘শরৎকাল’; বাংলার ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু। এই ঋতুতে বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ ধারণ করে প্রকৃতি। নীল আকাশে ধবধবে পেঁজো তুলোর মতো মেঘ, আর মৃদু বাতাস। মেঘ মুছে যাওয়া বর্ষণ শেষের আকাশে হাজার হাজার তারা ঝিকমিক করে জ্বলছে। রোদে ঝলমল করছে চারিদিক। দেখা যাচ্ছে নীল আকাশ স্বচ্ছ সাদা মেঘ। আর সাদা মেঘের ভেলায় ভাসছে কাশফুলের ছোঁয়া। শরতের দিনে কখনো কাঠফাটা রোদ, আবার পরক্ষণেই ঝুম বৃষ্টি। এ বছর ভাদ্র মাসেই শরতের এই চিরচেনা রূপ তেমন একটা দেখা মেলে। নদীর বাঁকে ফুটেছে সাদা ধবধবে কাশফুল। দৃষ্টিনন্দন এ কাশফুলের রাজ্য এখন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে পিরোজপুর ইউনিয়নের ভাটিবন্দর ও কান্দারগাঁওয়ে মধ্যবর্তী এলাকায় মেঘনা নদীর চরে। প্রায় ২০০ একর চরজুড়ে দেখা মেলে এমন কাশবনের। আর এ কাশবনের কাশফুলের ছোঁয়া নিতে ও এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ছুটে যান দর্শনার্থীরা।

প্রকৃতিতে এখন হাওয়া বইছে শরৎকাল। শিশু শিক্ষার বইতে ঋতু পরিচয়ে লেখা আছে ভাদ্র-আশ্বিন দুই মাস শরৎকাল। যদিও ভাদ্র মাসের অনেকটাই কোনো কোনো বছর প্রায় পুরোটাই বর্ষাকালের মধ্যে পড়ে, এমনকি আশ্বিন মাসেও বর্ষা থেকে যায়। এখন ভাদ্র মাসের শেষের দিকে। কবিও লিখেছেন মেঘে ঢাকা দারুণ দুর্দিনের আকুল আশ্বিনের কথা। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের ভেলা। নীল আকাশজুড়ে অলস মেঘের অবাধ বিচরণ। খণ্ড খণ্ড মেঘের নিরুদ্দেশ যাত্রা। রোদের ঝলকানির পাশেই মেঘের ছায়া। মেঘ আর রোদের কানামাছি খেলার মাঝে বৃষ্টিও অংশ নিচ্ছে। এমন দিনে সোনারগাঁওয়ে আপনাকে স্বাগত জানাতে কাশফুল ‘সাদা ডালি’ সাজিয়ে বসে থাকে। ফাঁকা জমিতে শরতের সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বসে আছে এ কাশফুল।

সোনারগাঁওয়ে ভাটিবন্দর ও কান্দারগাঁওয়ে মধ্যবর্তী এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে গেলে দেখতে পাবেন কাশফুলের রাজ্য। নদীর ধার ধরে ভেতরের দিকে যত যাবেন, ততই মুগ্ধ হবেন। দুই পাশে কাশফুলগুলো মাথা নুয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবে। বালুর মধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ কাশফুল দেখে মনে হবে, প্রকৃতি আপনার মনের প্রশান্তির জন্য এ রূপে সেজেছে। শেষ প্রান্তের দুই দিকে সাজানো কাশফুল দেখে মনে হবে, যেন আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কাশফুলের রাজ্যে। যত দূর চোখ যায়, তত দূর কাশের শুভ্রতা।

শরৎ কথাটি সরাসরি কোনো প্রতিশব্দ নেই, ইংরেজিতে (Autumn) হলো হেমন্ত ঋতু। বিলিতি অভিধানের ভাষায় গ্রীষ্ম ও শীতের মধ্যবর্তী সময়। কিন্তু গ্রীষ্ম ও শীতের মধ্যে আমাদের রয়েছে দীর্ঘ বর্ষাকাল। তবে ইংরেজিতে অনুবাদ করার সময় অনেকেই শরৎকাল বোঝাতে (Early Autumn) বা আগ হেমন্ত কথাটি ব্যবহার করেন। শরতের অন্যতম আকর্ষণ আকাশে সাদা মেঘের বালু চরে ফুটে থাকা কাঁশফুল। শরৎকালের অন্য অনুষঙ্গ, কাগজে ছবি নীল আকাশের সাদা মেঘের নিচে হাওয়ায় আন্দোলিত ক্ষুদ্র কাশগুচ্ছ বাংলাদেশের এখন সর্বত্র দেখা যায়। এখন সে সমাগত শরৎকাল ওই যে শোনো শোনো জঙ্গলে জঙ্গলে, বাগানে বাগানে, পাতায় ঝোপের আড়ালে আড়ালে ঘুম ভেঙে ডেকে উঠেছে কাকপাখি, ব্যাঙ, ঝিঁঝিঁ নানা ধরনের পোকামাকড়, শুনতে পাওয়া যায় কত পাখির ডাক। পাখিরা আনন্দে নেচে ওঠে এই শরৎ ঋতুতে। এ যেন আনন্দে বেজে ওঠার ঋতু। এ যেন মহানন্দে গান গেয়ে হৃদয়ের গভীর অভিব্যক্তি উজার করে দেয়ার ঋতু। এ শরৎ ঋতু সবচেয়ে দামি আর চোখ জুড়ানো কুচি নক্ষত্র অলঙ্কার মুক্তোর নাকছবি।

এখন বর্ষার শেষ দৃশ্য আসে আসে, দিনের বেলায় কখনো রোদ্দুর। ‘আমার রাত পোহালো শারদ প্রাতে’ গানের আশ্চর্য এই কলিটি সেই অনিন্দ স্বর্গ কণ্ঠ কৃনন্দ-লাল সায়গলে। আর এই স্বর্গ ছেড়া গানটি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শরৎকাল নিয়ে তার আশ্চর্য মায়াজালের অন্তরালে যেন উঁকি দেয় আমাদের ক্ষয়িভূত বা ভস্মীভূত পৃথিবী, এক ভূস্বর্গ আমাদের শরৎ ঋতু যেন চিত্রপিত বাংলা, নয়নালোভন হৃদয় হরণ।

লাল গোলাপি আলপাকা রোদ্দুর ফুটেছে। দিগন্ত থেকে রোদ্দুরের স্বপ্নফুল সোনা ফুল ছড়িয়ে পড়েছে। আকাশে-বাতাসে, মাঠে-প্রান্তরে, গাছের মাথায় মাথায় সবুজ ঘাসের গালিচায় চাঁদের সামিয়ানায়। আহা কি ঢলো-ঢলো, আলতো আলতো, থোকা-থোকা, ফাঁপা-ফাঁপা, মেখে নিই, চোখের মুখে গায়ে গলায় মেখে নিই ও পৃথিবী তুমি কি মোহিনী জাদু জানো, সেই যে স্বর্গের কবি পদ্য লিখেছিল তার কাঁচা সবুজ যুব বয়সে ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে। সত্যিই হে প্রভু কে মরতে চায় এই মর্ত ভূস্বর্গ ফেলে যে প্রাণ কানায় কানায় ভরে ছিল। প্রতি মুহূর্তে কানায় কানায় ভরে তুলছে এর আর তুলনা নেই। বিনিময় নেই বেঁচে আছি, হাওয়া লাগছে রোমকুপে তৃষ্ণায় ছুঁয়ে যাচ্ছে বিন্দু বিন্দু ভালো লাগা এর সাথে ভেসে আসছে নাম না জানা পাখির কলকাকলি গৌরী রোদ্দুর মেঘলা হলো ভাদ্র পড়েছে সবে চিনি ছাড়া তিতচায়ে চুমুক দিয়েছে, মায়ের কাছে গিয়ে বসি ভাই চলে গেল অফিসে বাসে যাবে, কারখানায় ভেপু বাজবে। আরিফ তিড়িং করে লাফিয়ে ছুটে গেল ওর ছোটবেলায়। কচি কণ্ঠে বলল, ওমা আমার ব্যাকারণ খাতাটা গেল কোথায়, ঝি বউয়ের বাসন মাজার শব্দ পাচ্ছি, আবার রোদ্দুরের অন্ধকার মুখ লালচে হয়ে যাচ্ছে, ভ্যান গাড়ির হর্ণ বাজছে। মা বলল, এই সেই সময় সকালের রোদ্দুরের এক রূপ ভোরে এক রূপ। বিকেলে এক বরণ, আবার সন্ধ্যায় লাগে আর এক।

পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, সাজ বদলাচ্ছে। এই আশ্চর্য শরৎ ঋতু। বিকেলে নীল আকাশ তার সমস্ত অঙ্গজুড়ে সাদা মেঘ। আমাদের ঋতুচক্রে শরতের মতো নির্মল কোমল প্রশান্ত স্বভাবের আর কেউ নেই। তার রঙ রূপ এমন প্রকট নয় যে সহসাই চোখে পড়ে। বরং চোখে দেখার যতটা তার চেয়ে বেশি বেশি ধরা পড়ে তার স্বরূপ হৃদয়ানুভাব। এই যাচ্ছে একেকটি দিন, কতই না বৈচিত্র্যময় তার সকাল দুপুর সন্ধ্যা। শিশিরসিক্ত শরৎ প্রভাতের সাথে কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যায় না রোদে ঝলসানো মধ্যাহ্নের। আবার চিকন হয়ে আসা বিকেলের রোদ মাখা নিস্তরঙ্গ প্রকৃতির মৌনরূপ যখন মৃদ কুয়াশার আবরণে আত্মসমর্থন করে দিনান্তের ঘোষণা দেয় তার ছবিও সম্পূর্ণ আলাদা।

শরতের এত রূপ, এত ঐশর্য, এত মোহ, এত ঋতু বৈচিত্র্য, এত রঙধনুর রঙ, এত নীল আকাশের নীলা, এত ছায়াপথের আলোছায়া, এত সূর্যাস্তের রক্তরাগ, এত ভোরের শিশির, এত কাশফুলের হেলাদোলা, আর এই বাঙলা মা ছাড়া কোথায় পাবো। চোখ জুড়িয়ে যায়, মন জুড়িয়ে যায়, জীবন জুড়িয়ে যায়, সব পেয়েছি আমার এই দেশের সোনার বাংলায়।