নিজস্ব প্রতিবেদক
রাশিয়ার এফইএস রিটেইলের কাছে বাংলাদেশী পোশাক কারখানাগুলোর রফতানি পাওনা নিয়ে বিরোধের প্রভাব যেন বাংলাদেশের পুরো পোশাক খাত ও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড এলপিপি। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর পাওনা-দেনা আইনগতভাবে দায়বদ্ধ সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথেই নিষ্পত্তি করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই পক্ষ।
গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও এলপিপির ডিরেক্টর (পারচেজিং অ্যান্ড ইএসজি) ডোরোটা জানকোভস্কা-টমকৌ এ অবস্থান জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাশিয়ার কোম্পানি এফইএস রিটেইলের কাছে প্রায় ৪০টি বাংলাদেশী পোশাক সরবরাহকারীর আনুমানিক চার কোটি ডলার রফতানি অর্থ পাওনা রয়েছে। ওই অর্থ না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো আর্থিক ও বাণিজ্যিক চাপে পড়েছে। স্থানীয় রফতানিকারকদের অভিযোগ, রাশিয়ার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটির সাথে চুক্তি সম্পন্নের ক্ষেত্রে এলপিপির ঢাকার কার্যালয় মধ্যস্থতা বা সহায়তা করেছিল। এ দিকে এলপিপি জানিয়েছে, বর্তমানে প্রকাশ্যে আলোচিত বিষয়টি মূলত চুক্তিবদ্ধ ও ইনভয়েস-সংক্রান্ত কিছু বকেয়া দাবির সাথে সম্পর্কিত। এসব দাবির ক্ষেত্রে এলপিপি কোনো দেনাদার বা আইনগতভাবে অর্থ পরিশোধে বাধ্য থাকা পক্ষ নয়। বাংলাদেশে তাদের প্রত্যক্ষ সরবরাহকারী ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের সাথে বিদ্যমান সব দায়-দেনা তারা নিয়মিতভাবে এবং প্রযোজ্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরিশোধ করে আসছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিবৃতিতে বিজিএমইএ বলেছে, এলপিপির এই অবস্থান তারা বিবেচনায় নিয়েছে। সংগঠনটি বলছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আইনগত দায় বর্তায়, তাদের কাছেই সংশ্লিষ্ট পাওনার দাবি উপস্থাপন করা উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলো যে কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটিও দুই পক্ষ স্বীকার করেছে। ফলে পাওনা নিষ্পত্তি নিয়ে যেকোনো আলোচনা আইনিভাবে দায়ী পক্ষের সাথেই হওয়া উচিত বলে তারা একমত হয়েছে।
তবে এ প্রক্রিয়ায় এলপিপি তার নিজস্ব আইনি অবস্থান অক্ষুণœ রেখে প্রয়োজন হলে গঠনমূলক সংলাপে সহায়তা করবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। এলপিপি আরো জানিয়েছে, বাংলাদেশে সম্প্রতি তাদের কিছু সোর্সিং কার্যক্রম পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় কর্মীদের সুরক্ষা দেয়া এবং আইনগত নিশ্চয়তা, স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই পর্যালোচনা কোনো প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি। একই সাথে বাংলাদেশে তাদের প্রত্যক্ষ চুক্তিভিত্তিক দায়বদ্ধতা যথাযথভাবে পালনের প্রতিশ্রুতিতেও এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
যৌথ বিবৃতিতে বিজিএমইএ ও এলপিপি বলেছে, বর্তমানে এলপিপির সাথে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত ৩৫০টিরও বেশি প্রস্তুতকারকসহ বাংলাদেশের পুরো পোশাক খাতের স্বার্থ রক্ষা করা জরুরি। সীমিতসংখ্যক তৃতীয় পক্ষের মধ্যকার বিরোধের কারণে যাতে অন্য প্রস্তুতকারক, শ্রমিক কিংবা এলপিপি ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
বিভ্রান্তিকর বা ভুলভাবে উপস্থাপিত প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, এ ধরনের প্রচার অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন প্রস্তুতকারক ও কর্মীদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যারা চলমান বিরোধের সাথে সরাসরি জড়িত নন। একই সাথে বাংলাদেশের পোশাক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অংশীদারের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিষয়টির একটি সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল সমাধান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং শিল্প অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ করবে বিজিএমইএ। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এলপিপির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যেকোনো ধরনের অনুচিত হয়রানি, চাপ কিংবা ভিত্তিহীন আইনি জটিলতা থেকে সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, এর মাধ্যমে আইনানুগ প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা ক্ষুণœ করা হচ্ছে না। একই সাথে আইনিভাবে দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বৈধ দাবি উত্থাপনের অধিকারও কোনো পক্ষের সীমিত করা হচ্ছে না।
এ দিকে এফইএস রিটেইলকে ঘিরে প্রায় চার কোটি ডলারের রফতানি পাওনা নিয়ে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে সংশ্লিষ্ট পোশাক কারখানাগুলোর আর্থিক চাপ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে বিজিএমইএ-এলপিপির যৌথ অবস্থানের মাধ্যমে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনগত দায়বদ্ধ পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের একটি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।



