পাবনা-সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পে ধস, বন্ধ ২ লাখ কারখানা

Printed Edition

বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা

  • লোডশেডিং ও ডিজেল সঙ্কট
  • কর্মহীন ৬ লাখ শ্রমিক

অব্যাহত লোডশেডিং, ডিজেলের সঙ্কট, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁতশিল্প অঞ্চল পাবনা ও সিরাজগঞ্জে উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় দুই লাখ বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম ও চিত্তরঞ্জন তাঁত। এতে প্রায় ছয় লাখ তাঁতশ্রমিক, ক্ষুদ্র তাঁতী ও সহায়ক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পাবনার সাঁথিয়া ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর বেসিক সেন্টার সূত্রে জানা যায়, দুই জেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ বিদ্যুৎচালিত তাঁত রয়েছে। পাবনা সদর, সাঁথিয়া, সুজানগর, বেড়া এবং সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি, উল্লাপাড়া ও সদর উপজেলায় তাঁতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এক সময় এখানকার উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি ও অন্যান্য বস্ত্র দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি হতো।

সরেজমিন তাঁতপল্লীগুলো ঘুরে দেখা গেছে, এক সময় যেসব এলাকায় তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত, সেখানে এখন অনেক কারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকেরা কাজের অপেক্ষায় অলস সময় পার করছেন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। যে পরিমাণ কাপড় উৎপাদিত হচ্ছে, তার ক্রেতাও মিলছে না। ফলে অনেক মালিক কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

পাবনার দোগাছি গ্রামের তাঁত কারখানার মালিক আবু জাফর বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে আগে ডিজেলচালিত জেনারেটরে কারখানা চালানো যেত। কিন্তু ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেটিও আর সম্ভব হচ্ছে না। চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে ১০ থেকে ১২ লিটার ডিজেল লাগে, এতে অতিরিক্ত দেড় হাজার টাকার মতো ব্যয় হয়। একই গ্রামের সুতা প্রস্তুতকারক ছামাদ ব্যাপারী বলেন, সুতা, রঙ, সানা-ববিনসহ প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে কাপড়ের দাম কমে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

জালালপুর গ্রামের তাঁতশ্রমিক জহির শাহ বলেন, আগে দিনে তিন থেকে চারটি শাড়ি তৈরি করা যেতো। এখন লোডশেডিংয়ের কারণে দু’টি শাড়িও তৈরি করা যায় না। সাঁথিয়ার সোনাতলা গ্রামের শ্রমিক সাদেক আলী, আব্দুল ছাত্তার ও আব্দুল কাদের জানান, আগে সপ্তাহে তিন থেকে চার হাজার টাকার কাজ পাওয়া গেলেও এখন তা নেমে এসেছে এক-দেড় হাজার টাকায়। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

শাহজাদপুর কাপড় হাটের পাইকার শহিদুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে কাপড়ের চাহিদাও কমেছে। আগে প্রতি সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ ট্রাক কাপড় বিক্রি হতো, এখন নেমে এসেছে এক থেকে দুই ট্রাকে।

বেড়া উপজেলা তাঁতী সমিতির সভাপতি আব্দুল গফুর বলেন, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের পাশাপাশি উচ্চমূল্যে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিকদের। তাঁতশিল্প টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

তাঁতশিল্পকে কেন্দ্র করে এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও আতাইকুলায় গড়ে ওঠা বৃহৎ কাপড়ের হাটগুলোতেও মন্দার প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, এক সময় এসব হাটে সপ্তাহে শত কোটি টাকার লেনদেন হলেও বর্তমানে কাপড় বিক্রি ও ব্যাংক লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।